১৯ জানুয়ারি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বক্তব্য দেন খোদ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্য উপদেষ্টারাও সরকারি খরচে বিভিন্ন এলাকায় সফরে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করছেন। শুধু তা-ই নয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিজ্ঞাপন, লিফলেট, ব্যানারসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচারে খরচ হয়েছে সরকারের মোটা অঙ্কের অর্থ। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তিকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নামতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আদেশ জারি করেছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি অর্থ ব্যয় করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, সরকার গণভোটে কোনো পক্ষ নিতে পারবে না। কোনো একটি পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য সরকার অর্থ ব্যয় করতে পারবে না। তবে গণভোটে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে পারবে। সরকারের ভূমিকা থাকবে নিরপেক্ষ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি কাজ করার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করে: ভোট, বিচার এবং সংস্কার। এখন সংস্কারের পক্ষে সরকার যদি প্রচার চালায়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে কাউকে চাপ দিতে পারবে না। চাপ সৃষ্টি করা ঠিক কাজ হবে না।
প্রধান উপদেষ্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের পেজে গণভোটের ‘হ্যাঁ’তে সিল দিন এ রকম একটি ফটোকার্ডও এরই মধ্যে শেয়ার করার পাশাপাশি ভিডিওচিত্রেও জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ভিডিওচিত্রে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য, গুম কমিশনের সদস্যের বরাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট কেন দিতে হবে, সেটির ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পাওয়া যাবে, সেটির বিস্তারিত উল্লেখ করে ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না–এমন প্রচারও চালিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যা’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এরই মধ্যে এসব কাজে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। সরকারি খরচে গণভোটের প্রচারের অংশ হিসেবে সরকার ১১ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট আটটি ফটোকার্ড শেয়ার করেছে।
গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতিতে সরকারের নির্বাচনি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য বরাদ্দের সঙ্গে গণভোট আয়োজনের অতিরিক্ত বাজেট যুক্ত হওয়ায় মোট নির্বাচনি ব্যয় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
ইসির বাজেট শাখা থেকে জানা যায়, গণভোটের প্রচারে ছয়টি মন্ত্রণালয় মোট প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি, তথ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৭১ লাখ, ধর্ম মন্ত্রণালয় ৭ কোটি, এলজিইডি ৭২ কোটি, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে।
এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, ‘প্রথমে আমরা নির্বাচনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। পরে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করার নির্দেশনা দেয় সরকার। সে মোতাবেক অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বাজেটের চাহিদা পাঠানো হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি।’
সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গণ্যমাধ্যমকে বলেন, “যারা গণভোট নিয়ে সমালোচনা করছেন, তাদের জানার পরিধি কম। মূলত সংস্কারের সমষ্টিগত প্যাকেজ হচ্ছে গণভোট। আমাদের তো সংস্কারের পক্ষে থেকে দেশের অপশাসন দূর করতে হবে। যাতে এ দেশে অপশাসন অথবা স্বৈরাচার ফিরে না আসে কিংবা শেখ হাসিনার মতো শাহি দৈত্যদানব না হয়, সে জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। চুরিচামারি বন্ধ করতে হলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষ নিতে হবে। যেহেতু এই সরকার সংস্কারের পক্ষে, তাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলছে।”