ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সেই আস্থাহীনতা বা ভরসা না পাওয়ার কথা জানিয়েই জাতিসংঘের কাছে তদন্ত সহায়তা চাওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা।
কিন্তু বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত আদৌ কি জাতিসংঘ করবে বা করতে পারে, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।
কারও কারও মতে, জাতিসংঘের কাছে তদন্ত বা বিচার চাওয়ার বিষয়টি স্বজন বা ‘সহযোদ্ধাদের’ (ইনকিলাব মঞ্চ) জায়গা থেকে যৌক্তিক মনে করলেও বাস্তবতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জাতিসংঘের যুক্ত হওয়ার নজির নেই। এ অবস্থায় আজ রবিবার অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরে (ওএইচসিএইচআর) সহায়তা চাওয়ার আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া চার্জশিটে আদালতের আদেশে পুনরায় তদন্তের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিআইডি সেভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তার মাঝেই তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা খবরের কাগজকে বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের তদন্ত সংস্থা যারা আছে, তারা ঠিকঠাক তদন্ত করতে পারছে না। এই ঘটনার পিছনে অনেক বড় মাস্টারমাইন্ড রয়েছে বলে আমরা মনে করি। এখানে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিষয় জড়িত থাকতে পারে বলেও দৃঢ় সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু সেখানে মাত্র ঢাকার একজন কাউন্সিলরকে মাস্টারমাইন্ড বলে দিয়ে তড়িঘড়ি করে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। এখানে অনেক সত্য বা প্রকৃত বিষয় উদঘাটন করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই আস্থাহীনতা বা অবিশ্বাস থেকেই আমরা জাতিসংঘের কাছে তদন্ত সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছি।’
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর মাত্র ১৯ দিন পর গত ৬ জানুয়ারি আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দিয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, যেখানে হাদি হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ঢাকার একজন কাউন্সিলরসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। কিন্তু প্রকৃত হোতারা আড়ালে রয়ে গেছে দাবি করে তখনই আপত্তি জানান মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এবং হাদির স্বজনসহ সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। এরপর থেকেই হাদি হত্যার তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তা নেওয়ার দাবি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ। সর্বশেষ কর্মসূচি পালন করার সময় গত শুক্রবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর বাংলামোটর-শাহবাগ এলাকার মধ্যে দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীদের। এদিন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশের ব্যাপক লাঠিপেটার ঘটনা ঘটে। এতে ইনকিলাব মঞ্চের শতাধিক নেতা-কর্মী এবং পুলিশেরও বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হন।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করেন, হাদি হত্যার তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তা চাওয়ার অর্থ–দেশের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা বা ভরসা না থাকা। গতকাল মুঠোফোনে নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধ ঘটলে সে বিষয়ে তদন্তের এখতিয়ার পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেখানে অনেক সময় আদালত বা সরকার বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিপর্যায়ের এ ধরনের ঘটনায় জাতিসংঘের তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া চালিয়েছে বলে অন্তত আমার জানা নেই।’
একই ধরনের তথ্য জানিয়ে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘যখন ভুক্তভোগী বা কোনো পক্ষ পুলিশ বা দেশের বিদ্যমান তদন্ত ব্যবস্থার প্রতি ভরসা রাখতে পারে না, তখনই এ ধরনের দাবি উঠতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণত, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণহত্যা, ভূ-রাজনীতি, ভূখণ্ড বিরোধসহ এই জাতীয় সামষ্টিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে থাকে বা রাখতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিপর্যায়ের হত্যার তদন্ত বা বিচারের বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকা রাখা বা যুক্ত হওয়ার কোনো নজির নেই।’
ড. ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখে আসছি, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্তের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। হাদি হত্যা মামলা নিয়ে সরকারও যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়ে যাচ্ছে। তারপরও জাতিসংঘের কাছে তদন্ত সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে।’
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি মারাত্মক আহত হন। মাথায় গুলিবিদ্ধ হলে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচারের পর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর মারা যান চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা শরিফ ওসমান হাদি। এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের পল্টন থানায় ১৪ ডিসেম্বর হত্যাচেষ্টা মামলা করলে হাদির মৃত্যুর পর এটা হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়। ডিবি পুলিশের পর আদালতের নির্দেশে বর্তমানে সিআইডি মামলাটির পুনরায় তদন্ত করছে। এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার একাধিক তারিখও পিছিয়ে গেছে। সময় নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সিআইডি।
এ প্রসঙ্গে গতকাল সিআইডি প্রধান (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. ছিবগাত উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিআইডির তদন্ত ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’ হিসেবে দেখা হয়। রিজার্ভ চুরির তদন্ত থেকে শুরু করে বহু জটিল ঘটনায় সিআইডির তদন্তে সফলতা রয়েছে। হাদি হত্যার ঘটনা বহুল আলোচিত, তদন্তের দিকে সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছেন। ফলে আমরা সেভাবেই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালাচ্ছি। এ ঘটনায় কারা মাস্টারমাইন্ড, কোথা থেকে কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে– সিআইডি সেগুলো স্পষ্টভাবে উদঘাটনে কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে হাদি হত্যা মামলার তদন্তে বেশ কিছু অগ্রগতিও রয়েছে। যেহেতু তদন্তাধীন বিষয় তাই আর বেশি কিছু বলছি না। তবে এই মামলার তদন্তের বিষয়ে আমরা ‘কনফিডেন্ট’ রয়েছি।’
ডিবি পুলিশের চার্জশিটে যারা আসামি
চার্জশিটের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ। এ ছাড়াও রয়েছে– ফয়সালের সহযোগী আলমগীর হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্নাল ফিলিপস, মুক্তি আক্তার এবং ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার। তারা সবাই পলাতক রয়েছেন।
বাকি কারাগারে আটক ১১ আসামি হলেন– ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, রেন্ট এ কার ব্যবসায়ী মুফতি মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মো. কবির, সিবিয়ন দিউ, সঞ্জয় চিসিম, মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু ও নরসিংদীতে অস্ত্রসহ আটক মো. ফয়সাল।