দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও এর ফলে নিউমোনিয়া হয়ে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এসব শিশুর কাউকে-কাউকে ভেন্টিলেটরের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখতে হয়। কিন্তু ব্যয়বহুল এই যন্ত্র সব হাসপাতালে নেই। আবার যেখানে আছে, সেখানেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে আইসিডিডিআর,বি (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশ) উদ্ভাবিত ‘বাবল সিপ্যাপ’ দেখাচ্ছে আশার আলো।
‘বাবল সিপ্যাপ’ উদ্ভাবনের নেতৃত্বে ছিলেন আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. মোহাম্মদ জুবায়ের চিশতী। গতকাল রবিবার দৈনিক খবরের কাগজকে তিনি বলেন, একটি ভেন্টিলেটরের দাম ১২ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। যেসব শিশুর ক্ষেত্রে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের ১০০ জনের মধ্যে ৯৩ জনের ক্ষেত্রেই বাবল সিপ্যাপ দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব। এটির খরচ মাত্র ৩০০ টাকা।
তিনি বলেন, অনেক হাসপাতালই দামি ভেন্টিলেটর যন্ত্র রাখতে পারে না। আবার যেখানে আছে সেখানেও প্রয়োজনের তুলনায় কম। অন্যদিকে ডাক্তার-নার্সসহ চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট যে-কেউ আধা ঘণ্টার কম সময় প্রশিক্ষণে এই যন্ত্র চালাতে পারবেন।
এটি ব্যবহারে আইসিইউর ওপরও চাপ কমবে বলে জানান ড. মোহাম্মদ জুবায়ের চিশতী। তিনি বলেন, আইসিইউতে একজন রোগীকে সার্বক্ষণিক নজরে রাখেন একজন নার্স। কিন্তু যে শিশুকে বাবল সিপ্যাপ দেওয়া হবে, সঙ্গে থাকা তার মা / অভিভাবককে কিছু বিষয় শিখিয়ে দিলে তিনি নজরদারিতে রাখতে পারবেন। যেমন: শ্বাস নিতে না পেরে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা শিশুটি বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে শ্বাস নিয়ে শান্ত হবে। আবার বাবল সিপ্যাপ ব্যবহারের সময় এতে অব্যাহতভাবে বাবল বা বুঁদবুঁদ ওঠার কথা। যদি শিশু শান্ত না হয় বা বুঁদবুঁদ না ওঠে, তাহলে তা ডাক্তার/নার্সের নজরে দেবেন শিশুর মা/অভিভাবক।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, ভেন্টিলেটর ব্যয়বহুল চিকিৎসা হওয়ার কারণে তা দেওয়ার আগে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু বাবল সিপ্যাপ নামমাত্র খরচের ব্যাপার হওয়ায় সংকটের শুরুতেই তা দেওয়া যায়। ফলে রোগী সুস্থ হয় তাড়াতাড়ি। তাড়াতাড়ি হাসপাতাল থেকেও ছাড় পায়। ফলে অন্য রোগে সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকিও কমে। কারণ এমন অনেক উদাহরণ আছে যে, শিশু যে রোগ নিয়ে এসেছে, তার চিকিৎসা হলেও অন্য রোগের সংক্রমণ নিয়ে বাসায় ফিরে গেছে।
এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত সাধারণ অক্সিজেন সরবরাহ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে শিশুর প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম, যা বাংলাদেশ এবং ইথিওপিয়ার গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান তারা।
প্রসঙ্গত, চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাবল সিপ্যাপ প্রযুক্তিটি প্রচলিত মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী, যার প্রতিটি ইউনিটের নির্মাণ খরচ মাত্র ৩০০ টাকার মতো।
যা মৃত্যু থেকে ফেরাচ্ছে হাজারও প্রাণ
বাবল সিপ্যাপ উদ্ভাবন চিন্তার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ড. মোহাম্মদ জুবায়ের চিশতী জানান, ইন্টার্ন হিসেবে কাজ শুরু করার প্রথম রাতে তার চোখের সামনেই অন্তত তিনটি শিশু নিউমোনিয়াজনিত সমস্যায় মারা যায়। তিনি বলেন, ‘তখন আমি খুব অসহায় বোধ করি। কান্নাও পেল।’
সেদিনই তিনি ভেবে রেখেছিলেন যে, শিশুর ফুসফুস নিয়ে পড়াশোনা করবেন। নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু রোধে কিছু একটা করবেন।
উচ্চতর পড়াশোনার মধ্যে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে একটি যন্ত্র (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ার প্রেশার বা সিপিএপি) দেখতে পান। নিজ থেকে নিশ্বাস নিতে পারে না– এমন রোগীর জন্য এ যন্ত্র। এটি গলায় বায়ুচাপ বৃদ্ধি করে, যা শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে যাওয়া রোধ করে। কিন্তু এটি ব্যয়বহুল।
দেশে ফিরে ড. চিশতী একসময় আইসিডিডিআর-বিতে গবেষণা কাজে যুক্ত হন। তখন তিনি একটি কম খরচের সিপিএপি তৈরিতে মনোযোগী হলেন। একপর্যায়ে এক দিন একটি ফেলে দেওয়া শ্যাম্পুর স্বচ্ছ বোতল নিলেন তিনি। এতে পরিমাণমতো পানি ভরলেন। বোতলের মুখের দিকটায় একটা প্লাস্টিকের নল লাগালেন। এর মাধ্যমে শিশু একটি ট্যাংক থেকে অক্সিজেন টানবে আর নলের মাধ্যমে পানিপূর্ণ এই বোতলে ছাড়বে, যা বোতলে বুঁদবুঁদ তৈরি করবে। বুঁদবুঁদের চাপ ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো খোলা রাখতে সাহায্য করবে। ফলে শিশুটি শ্বাস নিতে পারবে এবং শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ পাবে। তাৎক্ষণিক কয়েকটি শিশুর ওপর এটি ব্যবহার করে বেশ ভালো ফল পেলেন।
২০১৩ সালে পাওয়া এই সফলতা সারা দেশে ছড়াতে এক যুগ পেরিয়ে গেল! এ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করা হলে এই গবেষক বলেন, একটা সফলতা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া তো সরকারের ব্যাপার। আমরা তো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি না। আমাদের পরিসরে এটা জানিয়েছি। একবার একটি প্রোগ্রামে ডিজি (হেলথ) ছিলেন, তাকে জানিয়েছি। তিনিও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছেন কি না, জানি না।
বর্তমানে আইসিডিডিআর,বি বাবল সিপ্যাপ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে বলেও জানান তিনি।