ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রথমবার ইউএনএইচসিআর ব্যুরোর সভাপতিত্বে বাংলাদেশ মৌলভীবাজারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে জনসভাস্থলে নেতাকর্মীদের ঢল ব্যাপন, অভিস্রবণ ও প্রস্বেদন অধ্যায়ের ৭টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না বেরোবিতে রিডিং রুমের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে হলে টিভি স্থাপন, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকরির সুযোগ স্বীকৃত কূটনৈতিক পথে সমাধান খুঁজতে হবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড অনুমোদন নারী থাকুক নিরাপদে... মৌলভীবাজারে তারেক রহমানের জনসভায় চিরচেনা বিলবোর্ড-ব্যানারের অনুপস্থিতি স্বপ্নে জীবিত দেখার দাবি! ১৮ দিন পর তরুণীর কবর খনন নওগাঁয় রেল লাইনের পাশ থেকে কলেজশিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার টুকটুক ও চিকু পাঠ থেকে ২টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মেসির হ্যাটট্রি গোলে আর্জেন্টিনার জয়, হিলিতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ‘আমরা সবচেয়ে বিখ্যাত জুটি’, মোদিকে জর্জিয়া মেলোনি সিলেটে একদিনে হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু নাটোরে বলাৎকার মামলায় ২ জন কারাগারে ডলার স্থিতিশীল, বেড়েছে ইউরো ও পাউন্ডের দাম চাঁদপুরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস রাসুল (সা.)-এর চুল সাদা হলেও যেমন দেখাত ১৯৭৮ সালে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট বাবা, ৪৮ বছর পর একই মাঠে প্রধানমন্ত্রী ছেলে লক্ষ্মীপুরে স্কুলছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয় ভাঙচুর সিলেটে বৃষ্টিতে ভিজে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানালেন চা শ্রমিকরা ‘সমর্থকরা আর্জেন্টিনার এই দলকে নিয়ে পাগল’, ইতিহাস গড়ার পর মেসি সিলেট পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী ইরানি কৌশলেই উপসাগর থেকে গোপনে তেল সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ইতিহাস বদলানোর হুঙ্কার টমাস টুখেলের ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার খরচ করলেও ১১৪ বছরে শেষ হবে না মাস্কের সম্পদ প্রধানমন্ত্রীকে বরণে প্রস্তুত মৌলভীবাজারবাসী
Nagad desktop

মেঘনার পেটে মেঘনা

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১০ এএম
আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
মেঘনার পেটে মেঘনা
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর বিশাল অংশ দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি নদীর শাখা খালগুলোও দখল করে গড়ে তুলেছে একাধিক কারখানা। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এই দখল-প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্থানীয় এমপিসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নদী তীরবর্তী বাপ-দাদার আমলের জমি দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ। বিভিন্ন সময়ে এই দখলের কাজে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে সরকারি কর্মকর্তা, প্রতাপশালী রাজনীতিকসহ স্থানীয় নিজস্ব বাহিনী।

দেশের অন্যতম বড় নদী মেঘনা। নদীটি কেবল জলধারা নয়, দেশের অর্থনীতিতে রয়েছে এর ব্যাপক অবদান। পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় নদীটি যুগ যুগ ধরে ভূমিকা পালন করে আসছে। অথচ এখন নদীর জায়গা দখল করে নিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। দেশের অন্যতম শীর্ষ দখলবাজ মেঘনা গ্রুপের নদী দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অনুসন্ধান করেছে খবরের কাগজ।

সরকারি নকশা ও নথিপত্রে থাকা মেঘনা নদীর অনেকাংশ এখন বাস্তবে স্থলভূমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। নদী দখল নিয়ে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেঘনা গ্রুপ নদীর অংশ দখল করে বানিয়েছে স্থলভূমির বিস্তীর্ণ করিডর। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও অঞ্চলসংলগ্ন মেঘনা নদীর প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেঘনা গ্রুপ দখল-আধিপত্যের ‘রাজত্ব’ কায়েম করেছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চল দখল করে একাধিক কারখানা গড়ে তুলেছে এই প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে এসব তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ‘অজ্ঞাত’ কারণে বিভিন্ন সময়ে নদী উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। এমনকি বাস্তবায়িত হয়নি উচ্চ আদালতের রায়। উপেক্ষিত হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হুকুম-পরামর্শ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রভাবশালী মহলে প্রভাব বিস্তার করে মেঘনা গ্রুপ বছরের পর বছর ধরে উচ্ছেদ অভিযান ঠেকিয়ে রেখেছে ও নিত্যনতুন পন্থায় দখল ‘অভিযান’ চালিয়ে যাচ্ছে।

মেঘনা গ্রুপের অফিশিয়াল (নিজস্ব) তথ্যমতে, সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদীর তীরসংলগ্ন মেঘনা ইকোনমিক জোন গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ।  প্রায় ২৪৫ একর জায়গাজুড়ে শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে পেপার, টিস্যু, কেমিক্যাল, ফুড, এলপিজি, তেল, খাদ্য, প্যাকেজিং, সিমেন্ট, গার্মেন্টস ও রাসায়নিক কারখানা। রয়েছে পাওয়ার প্ল্যান্টও।

মেঘনার দখলের শুরু ১৯৮৯ সালে
সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনা ঘাট এলাকায় প্রথম কারখানা স্থাপন করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৮৯ সালে ছোট পরিসরে মেঘনা নদীর তীরে মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল কারখানা যাত্রা শুরু করে। পরে বছরের পর বছর ধরে (১৯৯০-২০০৫ পর্যন্ত) নদীর তীরে একের পর এক কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মেঘনা গ্রুপ। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নদীর অংশ (স্থানভেদে) ভরাট করে গড়ে তোলে শিল্প ক্লাস্টার। এরপর ২০১৬ সালে ওই এলাকাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পর বেড়ে যায় নদীর অংশ দখল। গড়ে ওঠে শিল্প ও পাওয়ার প্ল্যান্ট জোন। প্রায় ৩৭ বছরে এ অঞ্চলে তাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছাড়িয়েছে পঁচিশ।

অনুসন্ধানের শুরু মেঘনা নদীর নকশা-জরিপ থেকে
দেশে এখন নদ-নদীর ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারি সাতটি দপ্তরের। এর মধ্যে নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা, ভূমি জরিপ রেকর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটির হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভেসহ বিভিন্ন নথিতে (রেকর্ডকৃত) শনাক্ত হয়েছে মেঘনা গ্রুপের নদী দখলের ভয়াবহ চিত্র।

নদী-ভূমির নকশা: (ভূমি জরিপ রেকর্ড)
নদী-চর-ফ্লাডপ্লেইন করিডর নিয়ে ভূমি রেকর্ড, সরকারি জরিপসহ নথিপত্রে নদী-ভূমির প্রকৃতি স্থলভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মেঘনা নদীর উজানের আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুরে নদী বাঁক নিয়ে আনন্দ বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ কিমি বিস্তৃত। অপর প্রান্তে দুধঘাটা থেকে (পূর্ব-উত্তর) ঝাউচর পর্যন্ত মধ্যবর্তী নদীর সীমানা প্রায় ৬-৭ কিমি। এই পুরো অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার করেছে।

এর মধ্যে আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুর হয়ে ঝাউচর দিয়ে নদী সীমানার দুধঘাটা অংশ পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীর তীর ও নদী-ভূমিতে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া মেঘনা নদীর আনন্দ বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটারের বেশি জলাশয়ের ওপরে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানাসহ শিপইয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মধ্যে ঝাউচর, আষাঢ়িয়ার চর (স্থানভেদে) এলাকায় প্রায় ০.৮–১.৫ কিলোমিটার বিস্তৃত জলধারা ছিল। মেঘনা গ্রুপের দখলের ফলে এখন তা নেমে এসেছে ২০০-৫০০ মিটার খণ্ডিত চ্যানেলে। দখলের ফলে ইসলামপুর ও দুধঘাটা অংশে নদীর প্রস্থ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এ ছাড়া আনন্দ বাজার অংশে নদী কমে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০-৮০০ মিটার চ্যানেলে। এ অংশে নদীর ১ কিলোমিটারের নিচে রয়েছে জলাশয় ও চর। জমি ভরাটের কারণে এখানে প্রাকৃতিক প্রস্থ কমে সংকুচিত হয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ ও বিআইডব্লিউটির হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে অনুসারে, মেঘনা নদীর ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বিস্তীর্ণ করিডর—যে করিডরের ভেতরে রয়েছে চর রমজান, আষাঢ়িয়ার চর, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজা। গত তিন দশকে এই অঞ্চলে নদীর কার্যকর জলধারার অংশ ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে।

১৯৮৯ সালে ইসলামপুর (চর রমজান) অংশে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.২-১.৫ কিমি। ২০২৬ সালে এটি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩০০-৫০০ মিটারে। চর রমজান (ঝাউচর) এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় এক কিলোমিটার। ২০২৬ সালে এই প্রস্থ নেমে আসে ২৫০-৪০০ মিটারে। আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল ১.২ থেকে ১.৩ কিলোমিটার পর্যন্ত। ২০২৬ সালে এই প্রস্থ নেমে দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিটারের মধ্যে। দুধঘাটা এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল ০.৯-১.১ কিলোমিটারের মধ্যে। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ নেমে দাঁড়ায় ২০০-৪০০ মিটারে। এ ছাড়া পিরোজপুরে ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.১ কিলোমিটার। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ কমে দাঁড়ায় ৩০০ থেকে ৫০০ মিটারে। ছয়হিস্যা এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১ কিলোমিটার। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ কমে দাঁড়ায় ২৫০-৪৫০ মিটারে।

১৯৮৯ সালে আনন্দ বাজার অংশে থাকা নদী করিডরের জলাধার ও চর ছিল ২ থেকে ৪ কিলোমিটার চওড়া। প্রবাহের স্থান ছিল ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটারের মতো। ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ১.৫-২.৫ কিমিতে দাঁড়িয়েছে। খোলা পানির প্রবাহ কমে নদীর প্রাকৃতিক বিস্তার ছোট হয়ে গিয়েছে। মূল চ্যানেল এখন ১ কিলোমিটারের নিচে চলে এসেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজা এলাকায় (১৯৮৯-২০২৬) নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের মেঘনা নদী ছিল অনেক প্রশস্ত। নদীর বুকজুড়ে ছিল চর, আর তীরবর্তী এলাকায় বসতি ছিল সীমিত।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সরকারি নকশা-রেকর্ড-নথিপত্র-স্যাটেলাইট চিত্র ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করে প্রমাণিত হয়, উপজেলার বিভিন্ন মৌজার অধীনে চর বলাকি থেকে মেঘনা ঘাট হয়ে উজানের আনন্দ বাজার পর্যন্ত নদী ও তীরবর্তী অঞ্চল দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ।

নদীর পাড়ে মেঘনা গ্রুপ জেটি/বার্জ লোডিং ডক, সারি সারি বড় স্টোরেজ ট্যাংক ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্লক, ফ্রেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে। এগুলোর সীমানা সরাসরি নদীর ভেতরে বলে প্রমাণিত হয়েছে। আনন্দ বাজারে নদীর অংশ ভরাট করে মেঘনা গ্রুপ নির্মাণ করেছে এলপিজি ইউনিট। 

মেঘনার ঝাউচর-প্রতাবের চর অংশে নদীর প্রবেশমুখে ভরাট করে এখনো স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ নদীর এই অংশ থেকে  কয়েক কিলোমিটারজুড়ে দেয়াল দিয়েছে। এখানে টিস্যু-প্যাকেজিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারখানা নির্মাণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

পশ্চিম প্রান্তে শাখা নদীর (চর বলাকি-আষাঢ়িয়ার চরের পূর্ব প্রান্ত) মেঘনা গ্রুপ ফ্রেশ সিরামিক স্থাপন করেছে। এভাবে দখল করে কারখানা স্থাপন করায় নদী এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত নৌযান চলাচল। নদীর দুই পাশেই এখন মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। আষাঢ়িয়ার চরের দক্ষিণ সীমানায় নদীর অংশ ভরাট করে মেঘনা গ্রুপ একাধিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। 

গজারিয়ায় চর ও কান্দারগাঁয়ে মেঘনা গ্রুপ
সোনারগাঁও-গজারিয়া সীমান্তে মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে সরকারি জমি ও চর দখল শুরু করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে সেখানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নৌ চলাচল ও পরিবেশ, উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে। সরকারি নথিপত্র অনুসারে, এ অঞ্চলে নতুন করে নদীর তীরবর্তী কয়েক শ একর জমি কিনেছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অন্যতম।

এ ছাড়া নদীর পাড়ে কান্দারগাঁয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ভরাট করেছে মেঘনা গ্রুপ। এর বিস্তৃতি ছড়িয়েছে নদী পর্যন্ত। মেঘনা ঘাটের ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ করিডরে দীর্ঘদিন বালু ভরাট, চর দখল ও স্থায়ী নির্মাণ কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে বদলে দিয়েছে। ২০২০ সালে নদী ও চর এলাকার বড় অংশ স্থায়ী ভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এখন নদীর প্রাকৃতিক চ্যানেল পুরোপুরি সংকুচিত। মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর থেকে ঝাউচর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদী-ভূমিতে মেঘনা গ্রুপের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক দখল-ভরাটে এলাকাটি পূর্বের চেহারা হারিয়ে প্রায় অচেনা রূপ নিয়েছে।

মেঘনা গ্রুপের নদী দখল-আধিপত্য
মেঘনা নদী দখল হতে দেখেছেন নদী তীরবর্তী এমন ৪৩ জন স্থানীয় নারী-পুরুষ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ। তাদের অধিকাংশই একই তথ্য ও বিবরণ (মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল মেঘনা গ্রুপ দখল করেছে)  দিয়েছেন। এর মধ্যে দুজনের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

দুধঘাটা গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আবদুল লতিফ খবরের কাগজকে বলেন, মেঘনা গ্রুপ যখন এখানে আসেনি, তখন নদীটি ছিল বিশাল প্রমত্তা নদী। নদীর পাড়ে ছিল চর, স্থানীয় লোকজনের জমিও ছিল সেখানে। গত ১৬ বছরে উপজেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) সহসভাপতি ও পিরোজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম মেঘনা গ্রুপের হয়ে নদী ভরাটে যুক্ত হন। মাসুমের আগে মেঘনা গ্রুপের হয়ে নদী ভরাটের কাজ করেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম (বিডিআর)। মাসুম ও রফিক শুধু নদী ভরাটই করেননি, চরগুলোও দখল করে মেঘনা গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়দের জমিও তারা মেঘনা গ্রুপের হয়ে জোর করে দখল করেছেন। স্থানীয়দের জমি দখলে এই নেতারা দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা গ্রুপের বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে কাজ করেছেন। 

৩০ বছর আগের নদীর সীমানা দেখিয়ে আষাঢ়িয়ার চরের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘ফ্রেশ কোম্পানি (মেঘনা গ্রুপ) প্রথমে নদীর সীমানা ঘেঁষে জমি কেনে। তারপর নদীর অংশ দখল করা শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘মেঘনার শাখা নদীটি দুধঘাটা হয়ে আষাঢ়িয়ার চর হয়ে দুভাবে ঝাউচরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই শাখা নদীর দুই পাশই এখন মেঘনা গ্রুপের দখলে। এ কারণে শাখা নদীটি সরু হয়ে গেছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদুর রহমান মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক। তবে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি নদী নয়, চর ভরাট করেছেন।

এমপির ৩০ বিঘা জমিও মেঘনা গ্রুপের দখলে
স্থানীয় সংসদ সদস্য (নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন) আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপ আমার জমি দখল করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মেঘনা গ্রুপ আমার জায়গা দখল করে নিছে। আমার ৩০ বিঘা জমি এখনো মেঘনা গ্রুপের দখলে আছে।’

নদী দখলে মেঘনা গ্রুপ ক্ষমতাধর উল্লেখ করে মান্নান বলেন, আসলে স্থানীয়ভাবে বড় কোম্পানির সঙ্গে পারা যায় না। কিন্তু এই সরকার পারবে, কারণ তারা জনগণের সরকার। মেঘনা নদীর দখল নিয়ে সরকারের সকল পর্যায়ে ও জাতীয় সংসদে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।

নদী থেকে খাল, সবখানে দখল মেঘনা গ্রুপের
মেঘনা গ্রুপের দখলের হাত থেকে রক্ষা পায়নি এর শাখা খালগুলোও। মেঘনা নদী থেকে সৃষ্ট তিনটি খালই এখন মেঘনা গ্রুপের দখলে। খালের অংশ দখল করে কারখানা গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ। যেটুকু বাকি আছে, সেটুকুও দখল হয়ে আছে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে। 

৩ খালে কারখানা 
সরকারি নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা এবং ভূমি জরিপ রেকর্ড অনুসারে, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বসুন্দরদি নকশায় পাওয়া গেছে হরিগঞ্জ খাল। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই খালের প্রস্থ ছিল ২৫-৩০ ফুট। দখলের ফলে খালটির অনেক জায়গাই এখন ৫ থেকে ৮ ফুটের সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। একই ইউনিয়নের নরসুলদি নকশায় রয়েছে রামদির খাল। নকশায় খালের প্রস্থ প্রায় ২০-৩০ ফুট। এখন এটিও সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে হরিগঞ্জ খালের অংশে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানা ও রামদির খালের সীমানায় নির্মাণ করা হয়েছে মেঘনা শিপইয়ার্ড।

অপর প্রান্তে রয়েছে মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কুশাসন মৌজায় অবস্থিত ঝিউরতলা খাল। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে প্রায় ২০-৪০ ফুট চওড়া ছিল ঝিউরতলা খাল। দখলের কারণে এখন এটি একটি সরু খালে রূপ নিয়েছে। এই ঝিউরতলা খালের অংশেই গড়ে তোলা হয়েছে মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন।

ভোগান্তিতে খালপাড়ের বাসিন্দারা
হরিগঞ্জ খালের মুখ পুরোপুরি দখল করা হয়েছে বলে জানালেন আনন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা মহিবুল্লাহ প্রধান। তিনি বলেন, ‘হরিগঞ্জ খালের মাথায় মেঘনা নদীর সীমানা। ওই অংশটি দখলে নিয়ে মেঘনা গ্রুপ তাদের এলপিজি কারখানা নির্মাণ করেছে। এ অংশে তারা নদীর সীমানাও দখল করেছে। খাল দখলের বিরুদ্ধে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করেছে। তবে মেঘনা গ্রুপ স্থানীয় নেতা ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন দিয়ে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা হয়রানি করেছে।’

রামদি খালের অংশবিশেষ দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ। এ বিষয়ে মামরতপুর গ্রামের বাসিন্দা সানাউল্লাহ ব্যাপারী বলেন, ‘খালের সঙ্গে যেখানে নদীর সীমানা মিলেছে, সেখানেই মেঘনা গ্রুপ শিপইয়ার্ড বানিয়েছে।’ 

কামারগাঁও হয়ে ঝিউরতলা পর্যন্ত বয়ে যাওয়া খালও মেঘনা গ্রুপের দখলে বলে জানান এই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখানে মেঘনা গ্রুপ ইকোনমিক জোন বানানোর সময় ঝিউরতলা খালের অংশবিশেষ দখল করে নিয়েছে। খালের তিন ভাগের বেশির ভাগই তাদের দখলে। তারা এখানে দেয়াল তুলে খাল দখল করে রেখেছে। আর এই খালের বাকি অংশ দিয়ে তারা কারখানার বর্জ্য ফেলে।’

মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল প্রেস কাউন্সিলে একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা এক মামলায় জানিয়েছেন, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় তার প্রকল্প এলাকার দৈর্ঘ্য ১.১৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ০.২১ কিলোমিটার। তিনি সেখানে আরও জানান, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় কোম্পানির কেনা জমির পরিমাণ ২১০ বিঘা এবং সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমি ৭.৩৩ বিঘা। অর্থাৎ এই মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ২১৭.৩৩ বিঘা। অথচ নামজারিতে মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের নামে রয়েছে ৪৮.০২ বিঘা জমি। এটি মাত্র একটি মৌজার হিসাব। অন্যগুলোতেও অনুরূপ চিত্র পাওয়া যায়।

গুগল আর্থ: চিত্র বিশ্লেষণ
বিভিন্ন সময়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা, দুধঘাটা ও নরসুলদী মৌজা এলাকায় (১৯৮৯-২০২৬) নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। মেঘনা গ্রুপ নদীর ১২ কিলোমিটারের বেশি এলাকা ভরাট করে কারখানা স্থাপন করেছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের মেঘনা নদী ছিল অনেক প্রশস্ত। নদীর বুকে ছিল একচিলতে চর। মেঘনা গ্রুপ সেখানে এসে ধীরে ধীরে চারদিক দখল ও ভরাট করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। 

ভূমি কর্মকর্তার বক্তব্য
হোসেনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী  কর্মকর্তা (তহশিলদার) হাবিবুর রহমান মুন্সী বলেন, আষাঢ়িয়ার চর ও চর রমজান মৌজায় মেঘনা গ্রুপ নামজারি করা সম্পত্তির খাজনা (রাজস্ব) প্রদান করে আসছে। কিন্তু এখানে ‘ক’ তফসিলভুক্ত (সরকারি সম্পত্তির অংশ) বন্দোবস্ত নেওয়ায় সেগুলোর রাজস্ব তারা দেয় না। এর বাইরে নদীর দখলি অংশের কোনো রাজস্ব আসেনি।

মোগরাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার জানান, মেঘনা গ্রুপ শুধু নামজারি করা জমির রাজস্ব প্রদান করে। মেঘনা ইকোনমিক জোনের রাজস্ব মওকুফ করা আছে। এ ছাড়া কামারগাঁও, কুশাসন মৌজায় খালের অংশ মেঘনা গ্রুপের দখলে। এখান থেকে কোনো রাজস্ব আসে না।

প্রতিবাদ করায় পরিবেশকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানি
মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে নদী-খাল দখল ও দূষণ নিয়ে বহুবার প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে অভিযোগপত্র পাঠান তারা। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হোসাইন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘মেঘনা গ্রুপ মেঘনা নদীর অংশবিশেষ অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।’

হোসাইন খবরের কাগজে বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপের দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করায় আমিসহ অনেকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিবেদন করলেই মামলা করা হয়। এ কারণে কেউ সংবাদ প্রকাশ করে না।’

নদী রক্ষায় বর্তমান সরকারের কাছে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম।

তিনি বলেন, ‘নদী-নালা ও খাল-বিল রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মেঘনা গ্রুপের কাছ থেকে সুবিধা ও টাকা নিয়ে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সহযোগিতা করছেন। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) আমলে নদীকে ধ্বংস করে মেঘনা গ্রুপ। এবার তাই শীর্ষ দখলবাজ মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে জনগণের সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নয়তো একসময় মেঘনা গ্রুপ আর মেঘনা নদীই রাখবে না।’

নদী রক্ষা কমিশনের তদন্ত
২০১৯ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কয়েকটি দপ্তর নিয়ে গঠিত হয় ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁও এলাকায় অন্তত ৩০০ থেকে ১৬০০ বিঘা পর্যন্ত মেঘনা নদীর জমি বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী দখল করেছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ হচ্ছে শীর্ষ দখলবাজ। পরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের উদ্যোগে ২০১৯-২০২১ সাল পর্যন্ত দুই বছর তদন্ত চালানো হয়। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁও এলাকায় মেঘনা নদী ও প্লাবনভূমি অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করেছে মেঘনা গ্রুপ। তাদের অন্তত ৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি নদীর অংশে নির্মিত। কমিশনের তদন্তে নদী দখলকারী মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে বলা হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। 

মেঘনা নদী দখল-ভরাটে মামলা
২০১৪ সালে সোনারগাঁওয়ের মেঘনা নদী ও আশপাশের জলাভূমি ভরাট ও দখলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির  (বেলা) পক্ষে রিট মামলা করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি উপদেষ্টা ছিলেন। ওই মামলায় ২০১৮ সালে হাইকোর্ট নতুন ভরাট, দখল বা নির্মাণ বন্ধ করার আদেশ দেন।

২০২০ সালে হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে সোনারগাঁওয়ের ৬টি মৌজায় প্রায় ১৮৬৮ বিঘা জমি ও মেঘনা নদীর অংশ ভরাটকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ভরাট করা জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে প্রতিষ্ঠানটি। 

২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সোনারগাঁওয়ের ৬টি মৌজায়—মেঘনা নদীর অংশ, কৃষিজমি, নিম্নভূমি ও জলাভূমিতে মাটি ভরাটের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা দেন। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখাসহ নতুন করে ভরাট বন্ধ রাখতে বলে। স্থানীয় প্রশাসনকে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।

বাস্তবায়ন হয়নি উচ্চ আদালতে নির্দেশ, উদ্ধার হয়নি নদী
বারবার হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও নতুন করে ভরাট ও দখল চালিয়ে যাচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের নির্দেশ মেনে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি জেলা-উপজেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তর। কেউই প্রয়োগ কিংবা বাস্তবায়ন করেনি নদী রক্ষা আইন; বরং মেঘনা গ্রুপের দখলীয় নথিপত্র গোপন করতে দপ্তরের কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখেন মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে।

৩৬ বছরে দুবার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা
নদী ও খাল দখল নিয়ে মেঘনা গ্রুপ উচ্চ চাপে পড়ে এ পর্যন্ত মাত্র দুবার জরিমানা ও উচ্ছেদের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ মেঘনা নদী দখলে রাখা মেঘনা গ্রুপের প্রায় ৩৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে ও কাঠামো ভেঙে দেয়। এর আগে ২০১২ সালে আনন্দ বাজার এলাকায় (গ্রুপের এলপিজি ইউনিট) প্রায় ৩০ একর নদীতীর ও জলাভূমি ভরাট করার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর মেঘনা গ্রুপকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করে। একই সঙ্গে ভরাট করা অংশ নদীরূপে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

এবার নদী রক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসন কী করবে
সোনারগাঁওয়ে নদী ও খাল দখল নিয়ে বহুবার জেলা, উপজেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো তালিকা প্রস্তুত করেছে। তবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি কখনো। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তদন্তের পর ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও তা করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন।

দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটির মেঘনা নদীবন্দরের উপপরিচালক রেজাউল করিমের কাছে মেঘনা গ্রুপের নদী দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদী দখল বন্ধে তদারকি চলমান আছে। এখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিষয় নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশ দিলে সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে।  

সরকারের নির্দেশে দখল হওয়া নদী ও খালগুলো উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহাম্মেদ। পাউবোর সীমানায় কেউ স্থাপনা নির্মাণ করে থাকলে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানান তিনি।

নদী-খাল দূষণ করায় মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক এ এইচ এম রাসেদ। তিনি বলেন, মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে দূষণের অভিযোগ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তাদের দূষণের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে।

নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এবার প্রশাসন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসিফ আল জিনাত। তিনি বলেন, এখানকার নদী ও খালগুলো সংরক্ষণ করতেই হবে। তাই মেঘনা নদী ও খাল দখলের বিষয়ে যদি কোনো অভিযোগ বা প্রতিবেদন পাই, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে উপজেলা প্রশাসন। সরকারি নকশা-নথিপত্রে তথ্যে মিল পেলে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আইনানুগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মেঘনা গ্রুপের নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না–জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, ‘আগের কোনো জেলা প্রশাসক এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই। তারা যদি এখনো নদী-জমি দখলে রাখে, তাহলে জেলা প্রশাসন বিষয়টি দেখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

মেঘনা গ্রুপের কর্মকর্তাদের দাবি
নদী দখলের অভিযোগ ও সরকারি নোটিশের বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের আইন বিভাগের কর্মকর্তা (ম্যানেজার লিগ্যাল) আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানামতে নদী দখলের বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ বা যদি কোনো উচ্ছেদ অভিযান হতো, তবে সেটি সংবাদমাধ্যমের অগোচরে থাকার কথা নয়।’ নদী বা জায়গা দখলের বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই জানিয়ে আশফাকুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (টেকনিক্যাল) কার্তিক চন্দ্র দাস এ অঞ্চলের দায়িত্বে আছেন। কার্তিক চন্দ্র দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে বহুবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা দিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি। মেঘনা ইকোনমিক জোনে অবস্থিত তার অফিসে গেলেও সেখানে এই প্রতিবেদককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

মেঘনা গ্রুপের দখলদারত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (এডমিন) তৌফিক উদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি সাবেক একজন জেলা প্রশাসক। গত তিন বছর যাবৎ মেঘনা গ্রুপে দায়িত্ব পালন (চাকরি) করছি। এসব বিষয় আমি দেখি না, আমি গ্রুপের গাড়ি বা এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখি। এর বাইরে কোনো খবর আমি রাখি না। অন্য কারও বক্তব্য নিতে পারেন।’

আরও পড়ুন:
>> পাচার করা অর্থে বিদেশে রাখঢাক ছাড়াই মেঘনা গ্রুপের বিনিয়োগ
>> মেঘনা গ্রুপ ৮৬২ কোটি টাকার গ্যাস বিল দিচ্ছে না
>> মেঘনা গ্রুপ পাচার করেছে ৮০ হাজার কোটি টাকা
>> মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ তদন্তে দুদক
>> মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ

নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়
নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি কেটে জলাশয়ে পরিণত করেছেন ঠিকাদারের লোকজন। ছবি: খবরের কাগজ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পদ্মা সেতুর রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলারের নিচে থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন ঠিকাদার। পিলারের নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লক তুলে ফেলা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে মাটি কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাটি কাটায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত পদ্মা রেলসেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোর। প্রকল্পটির প্রধান নির্মাতা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। তবে বাংলাদেশের সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে রিংটেক লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান আলীগঞ্জ ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু) নির্মাণে যুক্ত ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো তারা প্রকল্পের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে যাচ্ছে। এমনকি বিক্রি থেকে বাদ যায়নি মাটিও।

গতকাল মঙ্গলবার আলীগঞ্জ উড়াল সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কাটার কারণে রেললাইনের সংযোগ সেতুর পাঁচটি পিলারের নিচের দুই পাশে মাটি নেই। রেললাইনের ৮৫ নম্বর পিলার থেকে শুরু করে ৮৯ নম্বর পিলার পর্যন্ত পিলারের প্রায় ১৭৫ মিটার এলাকাজুড়ে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকগুলো তুলে ওপরে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুর পিলারের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রতিবাদ জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক পরিচয়ে পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ট্রাকভর্তি করে দাপা এলাকায় নিয়ে গেছে। এলাকাবাসী বাধা দিলে ইটভাটার মালিক কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার এবং ফতুল্লা শ্রমিক লীগ নেতা আবু বক্কর তা মানেননি, বরং রেলসেতুর পিলারের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকও তুলে ফেলা হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তাও। মেম্বার এলাকাবাসীকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে তার ভাটার জন্য তিনি মাটি কিনেছেন। পরে মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের লোকজন মাটি কাটা বন্ধ করে দেন। তবে মাটি ফেরত এনে খনন করা গর্ত ভরাট করা না হলে রেল চলাচলের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। 

ভিডিও দেখে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওইখানে রেলওয়ের লোকজনসহ ঠিকাদারদের মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলার রক্ষার পরবর্তী কাজ করবে রেল কর্তৃপক্ষ।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাটি কাটার কোন বৈধ অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রায়হান কবির। তিনি খবরের কাগজে বলেন, মাটি কাটার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তাদের মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন তাই মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি গর্ত ভরাটে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

মুঠোফোনে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, রেলওয়ে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মাটি কাটার অনুমতি দেয় না। যারা মাটি কেটেছে তাদের মাটি নেওয়ার চুক্তিও নেই। তাদেরকে মাটি অপসারণের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদনহীন মাটি কাটার বিষয়ে ইতোমধ্যে রেলওয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটিই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে ব্রহ্মপুত্র কমবে পানি, বাড়বে খরার ঝুঁকি
ছবি: সংগৃীহত

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ছে ব্রহ্মপুত্র নদ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই নদে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অববাহিকা এলাকায় খরার তীব্রতা যেমন বাড়বে, তেমনি হুমকির মুখে পড়বে নদীর পরিবেশগত প্রবাহ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) একদল গবেষক এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জে চলতি বছর তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জারিন তাসনিম ও এ কে এম সাইফুল ইসলাম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইন্দ্রনীল সরকার, মো. সাইদুজ্জামান, খন্দকার এম অনিক রহমান, মোহাম্মদ আসাদ হোসেন এবং মো. সাদমান সাকিব। গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের অর্থায়নে ‘ইনহ্যান্সিং কোস্টাল রেজিলিয়েন্স থ্রু নেচার-বেজড সলিউশনস’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দূরপাল্লার পূর্বাভাস
গবেষণায় সিএমআইপি-৬ ক্লাইমেট প্রজেকশন (গ্লোবাল ক্লাইমেট মডেল) এবং সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার অ্যাসেসমেন্ট টুল–‘স্যাট’ নামক হাইড্রোলজিক্যাল মডেল ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্র নদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, ২০৪০ থেকে ২০৬৯ সময়কালে নদে পানির প্রবাহ সামান্য বাড়তে পারে। তবে ২০৭০ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সময়ে পানির প্রবাহ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

স্টান্ডার্ডাইজড ডিসচার্জ ইনডেক্স বিশ্লেষণ বলছে, ভবিষ্যতে এই অববাহিকায় শুষ্ক ও আর্দ্র চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ বাড়বে। বিশেষ করে দূর ভবিষ্যতে খরার তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা অনেক বেশি হবে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

নদীর স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি মডেল এসএসপি৩-৭.০ অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতেই নদীর প্রবাহ প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানির প্রবাহের এই নিম্নমুখী প্রবণতা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তসীমান্ত নদ, যা বাংলাদেশসহ চারটি দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় গবেষকদের পরামর্শ হলো অবিলম্বে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কংক্রিটের জঙ্গলে জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের মরণফাঁদে থাকা বাংলাদেশের শহরগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা আর যথেষ্ট নয়। এর বদলে শহর গড়ার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’ গ্রহণের বিকল্প নেই বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) এক নতুন প্রতিবেদনে।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘কম্পেনডিয়াম অন নেচার-বেজড সলিউশনস ফর আরবান রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রথাগত উন্নয়নের চেয়ে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে নেওয়া অবকাঠামোই ভবিষ্যতে শহরগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে পানিসংকটের মতো সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত ‘ধূসর’ বা কৃত্রিম অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে খরা
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ খরা এখন কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা কর্মসূচি-ক্লেয়ার প্রোগ্রামের অধীনে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ও অভিযোজনমূলক কার্যক্রম নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আজ ১৭ জুন ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এশিয়া ও আফ্রিকার খরাপ্রবণ অঞ্চলের পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্ব এমন সব খরার মুখোমুখি হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ভারত, নেপাল, উগান্ডা, তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। এই খরা কেবল ফসলের ক্ষতিই করছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংকট, জনবসতির স্থানচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সংঘাত খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, খরা মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তি বা অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পানির ন্যায্য বণ্টন। খরাপ্রবণ দেশগুলোকে জলবায়ু বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ সংকুলান রাখার পরামর্শও দিয়েছে ক্লেয়ার

শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধিনিষেধ সময়ের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

খেলার মাঠের হইহুল্লোড় কিংবা বইয়ের পাতার ঘ্রাণ–শৈশবের এই চিরচেনা অনুষঙ্গগুলো এখন অনেকটাই ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের শৈশব এখন বন্দি হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের নীল আলোর স্ক্রিনে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জৌলুশে বুঁদ হয়ে থাকা এই প্রজন্ম কেবল শারীরিক সক্ষমতাই হারাচ্ছে না, বরং জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ভয়াবহ অপরাধ ও মানসিক অস্থিরতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই লাগামহীন ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে ডেকে আনছে এক মারাত্মক বিপর্যয়। 

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে এখন নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন ও চীনের মতো দেশগুলোও নিয়েছে একই পথ। বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশে স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। 

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব ও মানসিক অবক্ষয়
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শিশুদের মধ্যে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তিবোধের এমন এক আসক্তি তৈরি করছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়া এই শিশুরা ক্রমেই সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার। অথচ প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা রূপ নিচ্ছে সামাজিক ব্যাধিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের সাইকোলজিক্যাল ও সাইকো-সোশ্যাল সমস্যা হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে।’

নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিশুদের বিপথগামী হওয়ার বিভিন্ন উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অল্প বয়সে বিয়ের মতো ঘটনা বাড়ছে, যা পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার সূত্র ধরেই এমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

কিশোর গ্যাং: স্মার্টফোনের অন্ধকার অধ্যায়
প্রযুক্তির আশীর্বাদের আড়ালে ডালপালা মেলছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। অপরাধের নীল নকশা তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া–সবকিছুর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। র‌্যাবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে প্রায় ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটক ব্যবহার করেই তারা অপরাধের যাবতীয় সমন্বয় করত। টিকটক বা ফেসবুকে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা অনেক মেধাবী কিশোরকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অপরাধের পথে।

বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইন, বিপিডিএ বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আলোকে আমরা সাইবার বুলিং মোকাবিলায় গুরুত্ব দিচ্ছি। যদি সরকার ভবিষ্যতে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা মনে করে, তবে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন নীতিমালা তৈরির সুযোগ রয়েছে। আইসিটি বিভাগ এবং ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএ) তখন সে অনুযায়ী কাজ করবে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে (আইসিটি বিভাগ) এখনো এ বিষয়ে কোনো কিছুই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। হয়তো এই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।’

ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং ও আইনি সুরক্ষা
অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সরকার ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি ও রিভেঞ্জ পর্নো ছড়ানোর মতো অপরাধের শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করেছে।

তবে আইনি প্রতিকারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম মনে করেন, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় রেস্ট্রিকশন আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

একক নয়, সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ
ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনলাইন সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে সনদ প্রদান করা হয়েছে। তবে পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ইউনিটে গত ৬ বছরে ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাইবার সহিংসতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক বন্ধনের যথাযথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার সময় এমন মতামত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুদের অপরাধ প্রবণতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কোনো একটি কারণকে কেন্দ্র করে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি অনেক উপাদানের একটি অংশ মাত্র।’

অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা মনে করেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। এ দেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রেই যৌথ পরিবারব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বেশ সক্রিয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো পিয়ার গ্রুপ এবং আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এই সামাজিক কাঠামো ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে যেকোনো প্রযুক্তি বা মাধ্যমকে পজিটিভলি কাজে লাগানো সম্ভব। এসব কারণেই অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট অনেকটাই মিনিমাইজ করা সম্ভব হয়।’

তবে এ বিষয়ে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অন্য দেশের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হুবহু মিলবে না। এ জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে সময় সাপেক্ষে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কনটেক্সট ভিন্ন হওয়ায় শিশুদের এই সংকট মোকাবিলায় কোনো একমুখী চিন্তার সুযোগ নেই বলেও মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট 
শিশু ও কিশোরদের ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ফেসবুক, টিকটকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং এসব প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করতে যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরী। আগামী রবিবার লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের পক্ষে তিনি এই রিট আবেদন করবেন। এতে বিবাদী করা হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি)। 

কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:১৬ এএম
কর্মসংস্থানের রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: খবরের কাগজ

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্প-বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশ কিছু খাতে রাজস্ব ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এমন হিসাবের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রণোদনা ও রাজস্ব ছাড় দিলেই কর্মসংস্থান বাড়বে, এমন না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েনের নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ না থামলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেড়েছে। বাজেটে এসব সংকট দূর করতে দিকনির্দেশনা নেই। আর তাই বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপে কর্মসংস্থান বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই।      

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেওয়া পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়ন হতে হবে। কর্মসংস্থান তিনভাবে বাড়তে পারে: সরকারি, বেসরকারি এবং বিদেশে। 

তিনি বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিতে চেয়েছে। এটা সরকারি খাতে কর্মসংস্থান। এভাবে কিছু কর্মসংস্থান সরকারের হাতে আছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ভূরাজনীতির ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির টানাপোড়েন কত দিন চলবে, তা আমরা জানি না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। শুধু প্রণোদনা, রাজস্ব ছাড় ও নীতি সহায়তায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে না। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য দুর্নীতি, জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ আরও অনেক কিছুর সমাধান দরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব সংকটের সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে আর তা কতটা বাস্তবায়ন হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।     

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ-তরুণীকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের এসআইসিআইপি কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

মন্ত্রী আরও বলেন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৭০ হাজার গ্রামীণ শ্রমিককে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। 

বাজেটে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সিং এবং অনলাইন মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশগামী ও প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ ব্যবস্থা চালুর কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় কর কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং স্টার্ট-আপ ও সিএসএমই প্রণোদনার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা যদি সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে শিল্পায়ন গতিশীল হবে, যা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্যচাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির ফলে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে নেমেছে, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। 

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সহসভাপতি এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এ ছাড়া ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব মিলিয়ে আগামীতে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়বে আর সেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—তার সম্ভাবনা কম। 

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। বাজেটে এই তহবিলের আওতায় বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তিন হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।  

প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধিতে আমাদের সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশে কর্মসংস্থান হোক আমরাও চাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে? সরকার এবারের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিয়েছে–এটা আশার কথা। এর জন্য কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন–যা ভালো উদ্যোগ বলে মনে করছি। কিন্তু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে তো! কারণ দেশের অর্থনীতির সংকট কাটিয়ে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিরসন না হলে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হবে। 

গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের অংশ মিশছে ঢাকায়

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:০০ এএম
গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের অংশ মিশছে ঢাকায়
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর উপকণ্ঠে সবচেয়ে বড় ও পরিকল্পিত ‘পূর্বাচল’ নতুন শহরকে একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য পূর্বাচলের গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অংশবিশেষ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রস্তুত সারসংক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) সভায় অনুমোদন পেলেই প্রশাসনিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তবে নিকার সভার তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার দুটি এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ১৪টি মৌজা (মোট ১৬টি মৌজা) ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে পূর্বাচল প্রকল্পের পুরো এলাকা কার্যত ঢাকা জেলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমানে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ–এই তিন জেলার মধ্যে বিভক্ত। ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা প্রদানে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় গত ২ মার্চ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পূর্বাচলকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং ঢাকা ওয়াসার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভা এবং ২৩ এপ্রিলের মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়টি নীতিগত অনুমোদন পায়। পরে মে মাসে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিও সারসংক্ষেপটি অনুমোদন করে।

তবে প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বাচল প্রকল্পের আওতাধীন ২১টি মৌজাকে প্রাথমিকভাবে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনায় ছিল। পরে চূড়ান্ত প্রস্তাবে তা কমিয়ে ১৬টি মৌজায় আনা হয়েছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পাড়াবার্থা ও বড়কাউ মৌজার আংশিক অংশ এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মাইঝগাঁও, হারারবাড়ী, ভোলানাথপুর, সুলপিনা ও পিতলগঞ্জ সম্পূর্ণভাবে এবং ইউসুফগঞ্জ, পশি, টেকনোয়াদ্দা, গুতিয়াব, বাঘবের, ব্রাহ্মণখালী, কামতা, হিরনাল ও রঘুরামপুরের আংশিক অংশ ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক তালিকায় থাকা কয়েকটি মৌজা বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মৌজার পরিবর্তে আংশিক এলাকা অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল জারি হওয়া ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এ রাজউকের কার্যপরিধি নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ১(২) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাজউকের আওতা ঢাকা মহানগরী ছাড়াও ঢাকা জেলার সাভার ও কেরানীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার নির্ধারিত এলাকাজুড়ে বিস্তৃত থাকবে। নতুন আইনে রাজউকের ভৌগোলিক কার্যপরিধি বহাল থাকলেও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পূর্বাচল প্রকল্পের অংশবিশেষকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার পৃথক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্বাচল বর্তমানে ৬ হাজার ২৬১ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প। এতে ৩০টি সেক্টরে ২৬ হাজার ২১৩টি আবাসিক প্লট, ৩ হাজার ৫৬৩টি বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্লট রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ৩১৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫২টি সেতুর মধ্যে ৪৯টির কাজ শেষ হয়েছে এবং ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ লেক ও খাল খননের মাধ্যমে নৌ-নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে প্রকল্পটি ২০১৯ সালে ‘এশিয়ান টাউনস্কেপ জুরি অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে।
তবে প্রশাসনিক বিভাজনের কারণে এখনো নাগরিক সেবা, ভূমি রেকর্ড, পুলিশি সেবা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় নানা জটিলতা রয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, একক প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা গেলে পূর্বাচলকে একটি স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করা সহজ হবে।

অন্যদিকে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার সভায় জেলার সীমানা পরিবর্তনের পরিবর্তে শুধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির গেজেট সংশোধনের বিকল্প প্রস্তাব দিলেও শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সম্মতি দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এখন প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় নিকার সভায় অনুমোদন পেলেই পূর্বাচলের প্রশাসনিক পরিচয়ে বড় পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ডিএমপি ও ঢাকা ওয়াসার আওতায় আনার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে যাবে। ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর হওয়ার পাশাপাশি পূর্বাচলকে রাজধানীর সম্প্রসারিত আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।