সুনামগঞ্জের হাওরে শুধু সরকারি হিসাবেই ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে; যার আনুষ্ঠানিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। তবে এই হিসাব এখন পর্যন্ত ৫০০ কোটি ছাড়িয়েছে। সুনামগঞ্জের গভীর হাওরে ধান এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে, যা কাটা হয়নি। সেগুলো এখনো হিসাবে আসেনি। যত দিন যাবে হাওরের ফসলের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
সুনামগঞ্জের হাওরে এবার কৃষকের ফসলডুবির কারণ হিসেবে হাওর নেতা এবং কৃষকরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানিতে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষকের একমাত্র ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পর্যাপ্ত স্লুইসগেট না থাকায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি সময়মতো হাওর থেকে বের হতে পারেনি, তাই বাঁধ কেটে হাওর থেকে পানি সরানো তাই সম্ভব হয়নি।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে টনের পর টন বালু ও পলি মাটিতে হাওর ও নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় সামান্য বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের পানি বাঁধ ভেঙে হাওরে প্রবেশ করে এবং সব শেষ শ্রমিক ও কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের সংকট থাকায় এবার হাওরে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হাওর নেতা ও কৃষকরা এই চারটি কারণকে সামনে এনে হাওর এলাকার মানুষের চতুর্থমুখী সংকটের কথা বলেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি, বাঁধের কাজে অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত বাঁধই সুনামগঞ্জের কৃষকের ক্ষতির কারণ বলে অভিযোগ করেছেন সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের সময়, মানে ১৫ ডিসেম্বর বাঁধ নির্মাণের সময় থেকেই আমরা পাউবো এবং সুনামগঞ্জের প্রশাসনের নানা গাফিলতির কথা তুলে ধরেছিলাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি জেলার সব বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার মেয়াদ থাকলেও কাজের সময় বাড়ানো হয়। আমরা হাওরের কৃষকদের নিয়ে বাঁধের কাজের অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ করেছি, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছি। তারা আমাদের কথা শোনেনি। এরপর যখন প্রথম দফার বৃষ্টি শুরু হয়, তখন ধানের মোচায় মাত্র দুধ এসেছে। সেই অপরিপক্ব ধান পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং পচে নষ্ট হয়। সেই সঙ্গে সুনামগঞ্জের সাবেক সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার দায়িত্বেও অবহেলা ছিল।’
তিনি বলেন, ‘সেই প্রথম থেকেই পাউবোর কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসককে বদলি করার কথা বলে আসছি।’
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিজন সেন রায় বলেন, ‘হাওরের বাঁধ নিয়ে সব সময় সব পক্ষ লুটপাট করে। টাকা নিয়ে তারা হরিলুট করে। আমরা এ নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করছি। আগেও করেছি, এখনো করছি। আমরা হাওরের নিরীহ কৃষকের জন্য কথা বলি। তাদের স্বার্থে আমরা কাজ করি। তাদের যদি ক্ষতি হয়, তাহলে আমরা তা মেনে নেব না। হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলডুবির ঘটনায় আমরা দোষী ব্যক্তিদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। ২০১৭ সালেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে সুনামগঞ্জের সব কটি হাওরের বাঁধ ভেঙে শতভাগ ফসলডুবির ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড় স্যার এবং ঠিকাদার জেল খেটেছেন। সেই মামলা এখনো চলমান। এবারও যদি কারও গাফিলতি থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সুনামগঞ্জের আরেক হাওর নেতা অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, ‘সুনামগঞ্জের কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন কিছু মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজের জন্য পানির নিচে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা কতবার কত বছর হবে। নিঃস্ব মানুষ আর সহ্য করতে পারছেন না। তারাও এ থেকে বের হতে চান।’
এনাম আহমদ বলেন, ‘সুনামগঞ্জের কৃষকের ফসলডুবির অন্যতম কারণ অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বাঁধ দেওয়া। তবে এর থেকে বড় কারণ হাওর ও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া। প্রতিবছর ভারতের সীমান্ত দিয়ে ঢলের সঙ্গে পলি এবং টনের পর টন বালু আসে। সেই বালুতে নদী হাওর ভরাট হয়ে পানি সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করছে। সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৫৪টি হাওর আছে, যা এক একটি পানির রিজার্ভ ট্যাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তলদেশ ভরাট হওয়ায় হাওর সেই পানি ধরে রাখতে পারে না। তাই আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে সমন্বিত প্রচেষ্টার। সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নিলে এই অঞ্চলের কৃষক ফসল তুলতে পারবেন আর তা না হলে প্রতিবছর হাওরে শুধু হাহাকার থাকবে। তবে অবশ্যই টাকাপয়সার ক্ষেত্রে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে স্বচ্ছ থাকতে হবে। হাওর ও নদী খননের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষক আমির উদ্দিন (৬৮) বলেন, ‘যে বাঁধ আমাদের ফসল বাঁচাতে বানানো হয়েছে, সেই বাঁধ এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাঁধের কারণে প্রথম দফা বৃষ্টির পানিতেই তলিয়ে গেছে আমাদের কাঁচা ধান। যদি হাওরে স্লুইসগেট থাকত, তাহলে জলাবদ্ধতার পানি সুন্দরভাবে নেমে যেত। কিন্তু বাঁধ থাকায় আমাদের সব ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা মনে করি, হাওরে বাঁধ কম করে দিয়ে স্লুইসগেট দিলে ভালো হবে। তাই সরকারের কাছে দাবি করি, সরকার অফিসারদের কথা না ভেবে আমাদের মতো কৃষকের কথা চিন্তা করে হাওরে পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কলাউড়া গ্রামের জয়নাল আবেদীন (৬০) বলেন, ‘উথারিয়া বাঁধের কারণে আমরা হাওরের সব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এই বাঁধ কেটে দিতে আমরা স্যারদের পায়ে পর্যন্ত ধরেছি, কিন্তু কাজ হয়নি। আগের সব ধান গেছে কাঁচা থাকতে, এখন বৃষ্টির পানিতে বাকি ধান গেছে। এখন কেটে আনা ধান রোদের জন্য শুকাতে পারছি না। এক মহাবিপদে পড়েছি আমরা। তাই এবার সরকারই আমাদের একমাত্র ভরসা।’
এ বছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ফসলের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। আবাদ হওয়া জমির মধ্যে হাওরের (নিচু অংশে) জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর, হাওর ছাড়া জমিতে (উঁচু অংশে) ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৬২ শতাংশ।
কৃষি বিভাগের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘হাওরে এখনো ২৯ ভাগ অর্থাৎ ৪৭ হাজার ৩৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি। নন-হাওরে রয়েছে ৭৫ ভাগ, অর্থাৎ ৪৩ হাজার ৭৪০ হেক্টর। ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। কৃষক তাদের একমাত্র ফসল কাটতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আমরাও তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। কৃষক যেন নির্বিঘ্নে ফসল তুলতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণের অনিয়ম, অপরিকল্পিত বাঁধের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘হাওরে কোথাও বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। মধ্যনগরের একটি বাঁধে সমস্যা হয়েছিল, সেই বাঁধও মেরামত করা হয়েছে। বাঁধ যাতে সুরক্ষিত থাকে, সে বিষয়ে জেলার সব কর্মকর্তা তৎপর আছেন। কোথাও কোনো সমস্যা হলে তা সঙ্গে সঙ্গে মেরামত করা হয়েছে। বাঁধের কাজে কোনো গাফিলতিও হয়নি। এর প্রমাণ জেলার কোথাও কোনো বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়নি। লাগাতার অতিবৃষ্টির কারণে ফসল ডুবে গেছে।’
অপরিকল্পিত বাঁধ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরের পরিকল্পিত বাঁধেই এবারও বাঁধ দেওয়া হয়েছে, তারপরও যেহেতু অপরিকল্পিত বাঁধ নিয়ে কথা উঠেছে, আগামী বছর বাঁধ নির্মাণের সময় অবশ্যই সবার মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে বাঁধ দেওয়া হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে এ বছর ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ হয়েছে।