রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ওসমানী উদ্যানটি টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা ২০১৬ সাল থেকে। এখনো মুক্ত হয়নি। এর উন্নয়ন, ধানমন্ডি লেক উন্নয়ন, ধুপখোলায় শিশুপার্ক নির্মাণ, পান্থকুঞ্জ পার্কের উন্নয়নসহ অনেক কাজের উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, যা ২০১৮ সালের জুনে শেষ করার কথা। প্রকল্পটি ৫ বার সংশোধন করে সাড়ে ৬ বছর সময় বাড়ানো হয়। যার মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। আর্থিক অগ্রগতি হয় ৭৯ শতাংশ। ঠিকাদাররা বিলও জমা দেন।
- ৯ বছরে কাজের অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ।
- ২ মাসে বাস্তবায়ন করতে হবে ২১ শতাংশ কাজ।
- এডিপিতে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে জীবিত রাখা হয়েছে ।
- প্রকল্প সংশোধনে আগের ধারায় গেলে হবে না। শ্বেতপত্র ও টাস্কফোর্সের সুপারিশ আমলে নিতে হবে: ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিল ছাড় আটকে যায়। সেই বিল পরিশোধ করার জন্য দেড় বছর পর সম্প্রতি প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে বিএনপি সরকার। এবার সময় বাড়ানো হয়েছে ২ মাস অর্থাৎ আগামী জুনে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২ মাসে ২১ শতাংশ কাজ কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশেষজ্ঞদের। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সড়ক, ফুটপাত, যাত্রী ছাউনি, ফুটওভার ব্রিজ, পুলিশ বক্স নির্মাণ, সড়ক বাতি নির্মাণ, আধুনিক কসাইখানা, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন, কবরস্থান, খেলার মাঠ, ধানমন্ডি লেক, নগর ভবন সংস্কারের ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সাবেক সরকার। এছাড়া ঢাকা মহানগর হাসপাতালের উন্নয়ন, ধলপুর ও গণকটুলি ক্লিনার কলোনি নির্মাণ, নতুন পাবলিক টয়লেট ও বিদ্যমান পাবলিক টয়লেট উন্নয়নসহ সব মিলে প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৬০ কোটি টাকা ও সরকারি কোষাগার থেকে ৮৪২ কোটি টাকা খরচ করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির কাজও শুরু হয়। প্রকল্প পরিচালকও নিয়োগ দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তবে কাজে গতি আসেনি।
বাড়ানো হয় খরচ
প্রথমবার সংশোধন করে খরচ বাড়ানো হয় ১২ কোটি টাকা। খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১২১৪ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয়বার সংশোধন করে প্রথমবারের চেয়ে ৫১৭ কোটি টাকা বা ৪৩ শতাংশ খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের খরচ ধরা হয় মাত্র ৮৬ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে খরচ করার অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। এভাবে খরচ ও সময় বাড়ানো হলেও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। এরপর খরচ না বাড়িয়ে তিনবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এক বছর করে। যার মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়।
তারপরও প্রকল্পটির পুরো কাজ শেষ হয়নি। ওসমানী উদ্যান উন্নয়নের কাজ ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারেনি। পান্থকুঞ্জ পার্কও বেড়ামুক্ত হয়নি। এর অভ্যন্তরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসের কাজ চলছে। এভাবে প্রকল্পের অন্য কাজও আটকে আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে ঠিকাদারের বিল আটকে দেওয়া হয়। তারা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও কূলকিনারা পাননি। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এ প্রকল্পটিতে মাত্র ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে জীবিত রাখা হয়েছে।
প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মাত্র ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এটিকে। বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পটির ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতেই ২ বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূইয়া বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০২৪ সালের জুনের পরিবর্তে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হলে ঠিকাদারের পাওনা পরিশোধ এবং অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা যাবে।’
নেই কোনো পরিচালক
সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির কোনো প্রকল্প পরিচালককে পাওয়া যায়নি। কারণ প্রথম প্রকল্প পরিচালককে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। দ্বিতীয় প্রকল্প পরিচালক মারা যান। ২০২৪ সালের জুনে মেয়াদ শেষ হওয়ায় কোনো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০২৪ সালের জুনে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। সে পর্যন্ত কাজের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছিল ৭৯ শতাংশ বা খরচ হয়েছে ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। এখনো সে অবস্থায় আছে। তবে সম্প্রতি প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। জিও (সরকারি আদেশ) জারি হলেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে। এই সময়ে ঠিকাদারের বকেয়া পরিশোধ এবং ওসমানি উদ্যানসহ অন্য বাকি কাজ সম্পন্ন হবে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় একদিকে নাগরিকরা যথাযথ সেবা পান না। অপরদিকে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমরা ক্রমান্বয়ে ঋণ নির্ভরতার দিকে চলে যাচ্ছি। এর পরিবর্তন আনা দরকার। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের এই প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে তো দূরের কথা ৫ বার সংশোধন করার পরও দীর্ঘ সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি। তাহলে ২১ শতাংশ কীভাবে ২ মাসে বাস্তবায়ন হবে তা কল্পনাই করা যায় না। প্রকল্প সংশোধনে আগের ধারায় গেলে হবে না। পরিবর্তনের ধারায় যেতে হবে। আমরা শ্বেতপত্র ও টাস্কফোর্সে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশ করেছি। প্রকল্প প্রণয়ন ও সংশোধনে তা আমলে নিতে হবে।’