কোথায় ১৯৫৮, ৬২, ৬৬ সালের বিশ্বজয়ী ব্রাজিলের পেলে, গারিঞ্চা, ভাভা, ১৯৯৪ সালের শিরোপা পুনরুদ্ধারকারী দলের তাফারেল, দুঙ্গা, রোনালদো, কাফু, আলদাইর, রোমারিও, বেবেটো, জর্জিনো, ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন দলের রোনালদিনহো, রোনালদো, রিভালদো, ডেনিলসন, রবার্টো কালোর্স, কাকার ব্রাজিল আর কোথায় এবারের ব্রাজিল!
একসময় যে দলে ছিল বিশ্বমানের তারকার ছড়াছড়ি, নাম ছিল সবার মুখে মুখে। খেলা দেখার জন্য সবাই থাকতেন উদগ্রীব হয়ে, এখানে সেখানে তারকা খুঁজতে হয় জাল ফেলে! বিশ্বমানের তারকা বলতে যা বোঝায় সেখানে নাম আসে নেইমার আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের। রাফিনহা, কুনিহা, কাসেমিরো, আলিসনও তারকা। কিন্তু তাদের নামে সমর্থকরা মন্ত্র পড়েন না।
এবারের ব্রাজিলের চেয়ে অনেক বেশি তারকাসমৃদ্ধ দল ছিল ১৯৮৬ সালে। যে দলে ছিলেন জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও জুনিয়র, কারেকার মতো সুপারস্টার। কিন্তু তাদের নিয়েও ব্রাজিল শিরোপা জিততে পারেনি। এমন কি ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে আসরে নেইমার, থিয়াগো সিলভা, মার্সেলো, পুলিনহো, ফ্রেড, হাল্ক, দানি আলভেস, জুলিও সিজারদের নিয়েও ব্রাজিল শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়। সেমিফাইনালে জামার্নির কাছে ৭-১ গোলে হেরেছিল। পরে হয়েছিল চতুর্থ। তাই এই দল নিয়ে ব্রাজিল এবার কতদূর যাবে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন।
ব্রাজিলকে নিয়ে এই প্রশ্ন শুরু হয় এবারের আসরে মরক্কোর বিপক্ষে তাদের প্রথম ম্যাচেই। ২০০২ সালের পর থেকে শিরোপা জিততে না পারা ব্রাজিলের হেক্সা মিশন শুরু হয় গোল হজম করে। ব্রাজিল তাদের ছন্দে ছিল না। খেলা দেখে সমর্থকদের মন আঁতকে উঠে। তারা হতাশ হন। আবার দলের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার নেইমার ইনুজরির কারণে খেলেননি।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই ভরসা। সেই ভিনিই পরে ব্রাজিলকে রক্ষা করেন গোল পরিশোধ করে। হতাশ বদনে ড্র করে মাঠ ছাড়েন সাম্বার সমর্থকরা। বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না তাদের। বুকে পাথর চাপা দিয়ে সব সহ্য করেন। তাদের এ রকম অবস্থার মাঝে আবার আর্জেন্টিনা শুরু করে উড়ন্ত শুরু। খুদে জাদুকর মেসি করেন হ্যাটট্রিক। লা আলবিসেলেস্তের সমর্থকরা যেন রীতিমতো আকাশে উড়ছেন।
একদিকে দুখের রজনি, অপরদিকে আনন্দের বন্যা। কিন্তু সেলেসাওদের করার কিছুই ছিল না। তাদের কিছু করে দেখাতে হলে দলকে জেগে উঠতে হবে। প্রয়োজন জয়। তবেই হবে পাল্টা জবাব।
বিশ্বকাপ ফুটবলে ফিফা দলের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি করুক না কেন, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থন তাতে কমবে না। গোটা বিশ্বে বলা যায় এই দুই দেশের সমর্থকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেখানে তো থাকে ‘হাইভোল্টেজ’। মনে হবে একসময়ের আবাহনী-মোহামেডান খেলছে। সময়ের পরিক্রমায় মোহামেডান-আবাহনী নিয়ে সেই উন্মাদনা এখন আর নেই। কিন্তু রয়ে গেছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে নিয়ে সেই মাতাল উন্মাদনা।
আগে ছিল কথার লড়াই। এখন সেখানে যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও। কে কাকে কতভাবে ট্রল করতে পারেন, তার একটা প্রতিযোগিতাও চলে। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করার পর ব্রাজিলের সমর্থকদের হতে হয়েছে ট্রলের শিকার। তবে সেই ট্রল আর বাড়তে দেওয়া কিংবা ঈশান কোণে ঝড় আর উঠতে দেননি ভিনিসিয়ুস-রাফিনহা-কুনহারা। লক্ষ্য যাদের ‘হেক্সা’ জয়, সেখানে কি তারা আর পেছনে ফিরে তাকাতে পারেন? হাইতির বিপক্ষে ফিরে আসে সাম্বা নৃত্য।
ছন্দের তালে তালে একের পর এক গোল করতে থাকেন। গ্যালারিতে দেখা যায় সেই চির চেনা সাম্বা নৃত্য। প্রথমে তাদের সেই উপলক্ষ এনে দেন ২৩ মিনিটে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ম্যাথিউস কুনহা। ১৩ মিনিট পর তিনি দ্বিতীয় গোল করে আবারও তাদের একই উপলক্ষ এনে দেন তিনি।
মরক্কোর বিপক্ষে গোল করে দলকে বাঁচানো ভিনিসিয়ুস বিরতির আগে ইনজুরি টাইমে গোল করে ব্রাজিলিয়ানদের সুখের রাজ্য আরও বিস্তৃত করে দেন। কুনহার গোলে সেই যে সাম্বা শুরু হয়েছিল, তা আর থামেনি। প্রথমার্ধেই ৩ গোল পেয়ে যাওয়াতে দ্বিতীয়ার্ধে আরও বেশি উন্মাতাল সাম্বা নৃত্যের অপেক্ষা করতে থাকেন সবাই। কিন্তু কোনো গোল হয়নি। তবে গোল না হলে কী হবে সাম্বা নৃত্য কিন্তু থামেনি। শেষ বাঁশি বাজার পরও চলতে থাকে।
২০০২ সালের পর থেকে শিরোপার খরায় ভুগতে থাকে ব্রাজিল তাদের হেক্সা মিশন পূরণ করতে গিয়ে পরের ৫ আসরেই হোঁচট খেয়েছে। ২০০৬, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে চতুর্থ হয়েছিল। বিবর্ণ ড্রয়ের পর স্বস্তির জয়ে সেলেসাওদের মনের ভেতর জমাট হয়ে থাকা পাথর সরে গেছে।
এখনো দৃষ্টি সামনে। কোচ আনচেলত্তি চান আরও ভালো খেলে উন্নতি করতে। আপাতত থাকতে চান গ্রুপের শীর্ষে। সে ক্ষেত্রে হারাতে হবে স্কটল্যান্ডকে। ২৫ জুন বৃহস্পতিবার মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় শুরু হবে খেলা। এই ম্যাচে খেলার সম্ভাবনা আছে দলের প্রাণভোমরা নেইমারের। তিনি খেললে বেড়ে যাবে খেলোয়াড়দের মনোবল। চাঙ্গা হবে দল। সাম্বা নৃত্যে ঢেউ লাগবে আরও বেশি করে।