হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে ৪৫তম ফিদে দাবা অলিম্পিয়াড। ওপেন ও মহিলা- উভয় বিভাগে বাংলাদেশ থেকে পাঁচজন করে প্রতিযোগী এবারের আসরে অংশ নিচ্ছেন। আজ ভোরেই হাঙ্গেরি উড়ে গেছে বাংলাদেশ দল। যাওয়ার আগে গতকাল রবিবার দাবা ফেডারেশনের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন খেলোয়াড়রা। যেখানে আলাদা করে সবার নজর কেড়েছেন দুজন- ওয়ালিজা আহমেদ ও ওয়াফিদা আহমেদ। তারা দুই বোন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম দুই বোন একসঙ্গে দাবা অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে যাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনের আগে-পরে ওয়ালিজা ও ওয়াফিদাকে সব সময় জুটি বদ্ধভাবেই দেখা যাচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও দুই বোন কথা বলছিলেন একসঙ্গে। দুজনেরই প্রথম অলিম্পিয়াড এটি। সেটাও একসঙ্গে। তাই তাদের চোখে-মুখে খেলা করছিল রোমাঞ্চ। দুজনের মধ্যে বড় ওয়ালিজাকে কথাবার্তায় জড়তাহীন লাগছিল। বলছিলেন, ‘আমরা দুজন একসঙ্গে খেলতে যাচ্ছি। খুবই ভালো লাগছে। ইতিহাসে তো এমন দৃষ্টান্ন বিরল।’ ওয়াফিদা বলেন, ‘আমারও খুব ভালো লাগছে। আমার বোন যেটা বলল, এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। কারণ বাংলাদেশে দুই বোনের একসঙ্গে অলিম্পিয়াডে যাওয়া এই প্রথম।’
বাংলাদেশ দাবায় এর আগে একসঙ্গে দুই বোন জাতীয় দলে খেলেছেন। তারা হলেন সৈয়দা শাবানা পারভীন নিপা ও সৈয়দা আফসানা পারভীন নীরা। তাদের ভাই সৈয়দ রুহুল কবীর শিপলুও দাবা খেলোয়াড় ছিলেন। নিপা-নীরার একসঙ্গে অলিম্পিয়াডে খেলা হয়নি। শুধুমাত্র নিপা খেলেছেন অলিম্পিয়াডে। ওয়ালিজা ও ওয়াফিদা তাই এক অর্থে হাঙ্গেরিতে ইতিহাসই গড়তে যাচ্ছেন।
ওয়ালিজা এ বছর এইচএসপি উত্তীর্ণ হয়েছেন। ছোট বোন ওয়াহিদা পড়ছেন নবম শ্রেণিতে। তবে প্রায় একই সঙ্গে তাদের দাবায় হাতেখড়ি। ওয়ালিজা ২০১৬ সাল থেকে দাবা খেলছেন। ওয়াহিদা খেলছেন ২০১৭ সাল থেকে। জাতীয় দাবায় কখনো চ্যাম্পিয়ন না হলেও জুনিয়র জাতীয় দাবায় দুজনই সেরা হয়েছেন। আর সেটাও পরপর দুই আসরে। জাতীয় দাবায় ওয়ালিজার সেরা সাফল্য একবার রানার্সআপ হওয়া। ওয়াহিদা সবশেষ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেই তৃতীয় হয়েছেন, যা তার সেরা সাফল্য।
দুই বোনের শুরুর গল্পটা কেমন? ওয়ালিজার কাছে এ গল্প জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার বাবা মাইনুদ্দিন আহমেদ জাতীয় খেলোয়াড় ছিলেন। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি বিভিন্ন দেশে খেলতে গেছেন। বিদেশে প্রাইজ পেলে বড় বড় ট্রফি দেয়, বড় বড় কাপ দেয়। ছোটবেলা থেকে ওগুলো দেখতে দেখতেই দাবার প্রতি আমার আকর্ষণ হয়। প্রথমে বুঝতাম না এগুলো কি। মনে হতো এত বড় মগ, এগুলো দিয়ে কি করে। কিছু তো খাওয়াও যাবে না এগুলো দিয়ে। কৌতূহল থেকে তাই এগুলো প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা।’ ওয়ালিজা বলে যান, ‘আমার মা মূলত আমাকে দাবাতে নিয়ে আসেন। বাবা খেলতেন, কিন্তু চাকরি করতেন। আমাকে সময় দিতে পারতেন না। কিন্তু আমার মার আগ্রহের কারণে আমি দাবাতে এসেছি।’
ছোট বোন ওয়াহিদার কাছে তার শুরুর গল্প জানতে চাইলে বলেন, ‘আব্বু আর আপু যখন খেলত, তখন বসে বসে দেখতাম। খুব ভালো লাগত।’ এ সময় ওয়াহিদার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ওয়ালিজা বলেন, ‘ওকে আলাদা করে চাল শেখাতে হয়নি। দেখে দেখেই শিখেছে। একদিন দেখি ও চাল দিতে পারছে।’ ওয়াহিদা বলেন, ‘নিয়মগুলো আমার বোন আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে। আমার বাবা ইতালি থেকে এসে চাল লেখা শিখিয়েছেন।’
ওয়ালিজা ও ওয়াফিদার বাবা দীর্ঘদিন ধরেই ইতালিতে থাকেন। এক সময় তারা দুই বোনও থাকতেন সেখানে। পরে মার সঙ্গে পড়াশোনার জন্য চলে এসেছেন দেশে। পড়াশোনার সঙ্গে এখন তারা দাবা খেলাতেও ছুটে চলেছেন। ওয়ালিজা এর আগে দুবার অলিম্পিয়াডে সুযোগ পেলেও খেলা হয়নি। ২০১৯ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় হয়ে অলিম্পিয়াডের টিকিট কাটেন। কিন্তু পরের বছর সেই অলিম্পিয়াড করোনার কারণে হয়নি। ২০২২ সালে চেন্নাই অলিম্পিয়াডের দলেও সুযোগ পান তিনি। এ দফায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্সআপ হয়ে এই যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার কারণে এবারও খেলতে যেতে পারেননি। এবারের জাতীয় দাবায় কিংবদন্তি রানী হামিদের সঙ্গে প্লে-অফ জিতে অলিম্পিয়াডের টিকিট কেটেছেন। এবারও শেষ মুহূর্তে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় কি না সেই শঙ্কায় ছিলেন ওয়ালিজা, ‘দেশের যে অবস্থা তৈরি হয়েছিল (রাজনৈতিক পরিস্থিতি), ভাবছিলাম এবারও কি খেলতে পারব না?’
শেষ পর্যন্ত খেলতে যেতে পারছেন ওয়ালিজা। সেটাও দুই বোন একসঙ্গে। এবার ওয়ালিজার আগেই অলিম্পিয়াডের টিকিট নিশ্চিত করেছিলেন ওয়াফিদা। লক্ষ্যের কথা জানতে চাইলে ওয়ালিজা বলেন, ‘লক্ষ্য অবশ্যই ভালো করা। যেহেতু টিম ইভেন্ট। টিম হিসেবে ভালো করতে চাই, পাশাপাশি ইন্ডিভিজ্যুয়ালভাবেও ভালো করতে চাই।’ ওয়াফিদার কণ্ঠেও ছিল একই প্রত্যয়। দাবা নিয়ে দুই বোনের স্বপ্নও একই। ওয়ালিজা বলেন, ‘স্বপ্ন গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া এবং দেশের নাম বিশ্ব দরবারে নিয়ে যাওয়া।’ ওয়াফিদার কথা, ‘আমার স্বপ্নও একই। প্রথমত বাংলাদেশে তো কোনো নারী গ্র্যান্ডমাস্টার নেই। দেশের প্রথম নারী গ্র্যান্ডমাস্টার হতে চাই।’