সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের শুরুটা ছিল হতাশার। একে তো পাকিস্তানের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত ড্র, সঙ্গে দলের অন্দরমহলে নানামুখী বিবাদের গুঞ্জন। সবমিলিয়ে প্রবল চাপ জেঁকে বসে লাল-সবুজ শিবিরে। তবে ভারতকে গুঁড়িয়ে সব চাপ যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। বিবাদ কিংবা কলহ, খবরের কাগজের মুখোমুখি হয়ে অধিনায়ক সাবিনা খাতুন মুখ খুললেন এসব নিয়েই। কাঠমান্ডুতে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফায়েল আহমেদ।
খবরের কাগজ : ভারতকে তো রীতিমতো গুঁড়িয়ে দিলেন আপনারা। অনেক চাপের মধ্যে থেকেও কীভাবে সম্ভব হলো এটা?
সাবিনা খাতুন : সব কৃতিত্ব মেয়েদের দেব। সবাই অসাধারণ খেলেছে। আর রহস্য যদি জানতে চান, তাহলে সেটা কোনো জাদু-মন্ত্র ছিল না। আমরা ভালো খেলতে পারি এবং ভালো খেলতে পারব, এই বিশ্বাসটা ছিল। মেয়েরা নিজেদের জন্য খেলেছে, দেশের জন্য খেলেছে, দেশের সম্মান রক্ষার্থে খেলেছে।
খবরের কাগজ : ভারত ম্যাচ শেষে হোটেলে ফেরার পর জয় উদযাপনটা কেমন হলো?
সাবিনা খাতুন : কোনো উদযাপন হয়নি। এখন মেয়েদের সবার দৃষ্টি সেমিফাইনালে। আর এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, সবকিছুর জন্য আলহামদুলিল্লাহ।
খবরের কাগজ : কিন্তু পাকিস্তান ম্যাচের পর তো অনেক সমালোচনা চলছিল। মনিকা চাকমা বলেছিলেন প্রধান কোচ পিটার বাটলার সিনিয়রদের পছন্দ করেন না। এরপর ভারত ম্যাচে সিনিয়রদের প্রধান্য দেওয়া হলো। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি কতটা জটিল ছিল আপনাদের জন্য?
সাবিনা খাতুন : সত্যি বলতে এটার জন্য অনেক ফাইট করতে হয়েছে। এক প্রকার বলা যায় এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, যখন এরকম একটা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তখন কোচও খুশি হননি।
খবরের কাগজ : আপনি কি মনে করেন মারিয়া মান্দা, মাসুরা পারভীনদের বিকল্প তৈরি হয়েছে?
সাবিনা খাতুন : আমার কাছে মারিয়া-মনিকা মিডফিল্ডে বেস্ট জুটি। ওই জায়গাতে আমার মনে হয় না বিকল্প কেউ এখনো তৈরি হয়েছে। আর মাসুরা যদি ডিফেন্সে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে আমাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। ওরা দলের জন্য অপরিহার্য। পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ম্যাচের পর হোটেলে দেখা। ওরাই বলল- মারিয়া, মাসুরা, সানজিদা, কৃষ্ণাদের একাদশে না দেখে ওরা অবাক হয়েছিল।
খবরের কাগজ : সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে জুনিয়র খেলোয়াড়দের কোন্দল চলছে বলে গুটি কয়েক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে কি বলবেন?
সাবিনা খাতুন : এই বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। আমি খুবই বিস্মিত যে এই বিতর্কটা আপনাদের মিডিয়া থেকে তৈরি করা হয়েছে। আমার দলে জুনিয়ারদের সঙ্গে সিনিয়ররা যেভাবে মিশে, এখানে বিতর্কের বিষয়টা তো আসাই উচিত না। সিন্ডিকেটের কথাও এসেছে। ভেতরে কি হচ্ছে সেটা খেলোয়াড়রা জানে। আমরা কি সাফার করে আসছি, সেটা আমরা জানি। এটা হচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে ইতিবাচক বিষয়ের চেয়ে নেতিবাচক বিষয় দ্রুত ছড়ায়। আপনারাই জুনিয়র খেলোয়াড়দের এ নিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো ধরনের সমস্যা ছিল না। যারা এই কমেন্টগুলো করে খেলোয়াড়দের মেন্টালি ডাউন করছে, তাদের এসব করা থেকে বিরত থাকা ভালো।
খবরের কাগজ : কিন্তু এটাও তো ঠিক যে ২০২২ সালের সাফে আপনারা যেমন খেলেছেন, শেষ কয়েক মাস আপনারা সেভাবে খেলতে পারছেন না। তাহলে সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে?
সাবিনা খাতুন : খুব ভালো একটি পয়েন্টে এসেছেন। এই যে সিনিয়র-জুনিয়র বিতর্ক ছড়ানো হচ্ছে, এসব না করে আমার মনে হয় আমাদের মেয়েরা দুই বছর আগের মতো কেন পারফর্ম করতে পারছে না, এটা ভাবা উচিত। মেয়েরা কেন এত ডিমোটিভেটেড হয়ে গেছে, এটা ভাবা উচিত।
খবরের কাগজ : আপনি বললেন, মেয়েরা কেন ডিমোটিভেটেড হচ্ছে, এটা খুঁজে বের করা উচিত। আপনার মুখ থেকেই বিষয়টা জানতে চাই?
সাবিনা খাতুন : আপনারা বলছেন দুই বছর আগের মতো পারফরম্যান্স নেই। কিন্তু এই সময়ে আপনারা মেয়েদের জন্য কয়টা ম্যাচ আয়োজন করতে পেরেছেন? সারা বছর ট্রেনিংয়ে থেকে যদি মেয়েরা উন্নতি করতে পারত, তাহলে বিশ্বের সেরা দল হতো বাংলাদেশ। কিন্তু সারা বছর ট্রেনিং থেকে ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলে উন্নতি কীভাবে দেখতে পাবেন? মেয়েদের যখন যথেস্ট সুযোগ-সুবিধা দিতে পারবেন, তখন খারাপ করলে প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার থাকবে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে উন্নতির প্রশ্নগুলো তোলা উচিত না।
খবরের কাগজ : আলোচনা আছে আপনারা সিনিয়র খেলোয়াড়রা বিভিন্ন বিষয়ে সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তাহলে বর্তমান কোচ কি আপনাদের যথেষ্ট মোটিভেটেড করতে পারছেন না?
সাবিনা খাতুন : আমি ১৪ বছরের সম্পর্কের সঙ্গে ৬ মাসের সম্পর্ক কখনোই এক করতে চাই না। ছোটন স্যারের সঙ্গে দীর্ঘ ১৪ বছর আমি কাজ করেছি। আমার কাছে মনে হয় আমি নিজেকে যতটা না চিনি, তার চেয়েও তিনি (ছোটন) আমাকে বেশি চেনেন। তাই তার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে শরণাপন্ন হতেই পারি। এটা গুরু-শিষ্যের ব্যাপার। আর বর্তমান কোচের প্রতিও আমার যথেষ্ট সম্মান আছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।