কটা সময় ছিল ফুটবলে সমর্থন মানেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। ইতালি, জার্মানিসহ অন্যান্য দেশের সমর্থক থাকলেও তা যেন খুব সামান্য! শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা ফুটবলবিশ্বেই এমন চিত্র দেখা গেছে। কিন্তু স্পেন ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো জয়ের পর এই চিত্র পাল্টাতে থাকে। ওই সময় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে অনিন্দ্য সুন্দর স্পেনকে সমর্থন শুরু করে নতুন প্রজন্ম।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও বড় স্বপ্ন নিয়ে মিশন শুরু করেছিলেন স্পেনের টগবগে যুবারা। কিন্তু প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে অপ্রত্যাশিতভাবে টাইব্রেকারে মরক্কোর কাছে ৩-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল লা রোজাদের। যার ফলে দীর্ঘ ১০ বছরের ব্যর্থতা ঘোচাতে তারা ব্যর্থ হয়। এর আগে ২০১৪ ও ২০১৮ বিশ্বকাপেও ভক্ত-সমর্থকদের হতাশ করে স্পেন। তবে এবারের উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে তরুণদের নিয়ে ফের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনছে ২০১০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের নিয়ে ঘষামাজা করে দারুণ একটি দল দাঁড় করিয়েছেন। সেই তরুণদের কাঁধে ভর করেই এবার নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে স্প্যানিশরা।
সেই মিশন শুরু হচ্ছে অবশেষে। ‘এইচ’ গ্রুপের ম্যাচে প্রথমবার বিশ্বকাপে ওঠা আফ্রিকার ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দের মুখোমুখি হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের হট ফেভারিট স্পেন। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে আজ (১৫ জুন) রাত ১০টায়। ম্যাচটি একদিকে যেমন বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার স্পেনের অভিযাত্রার সূচনা, অন্যদিকে কেপ ভার্দের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত।
স্পেন ও কেপ ভার্দে এর আগে কখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। ফলে এবার দুই দলের ইতিহাসের প্রথম সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। স্পেন দলে রয়েছেন অধিনায়ক রদ্রি, পেদ্রি, লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, উনাই সিমনের মতো বিশ্বমানের তারকা। ইউরো ২০২৪ জয়ের পর থেকে দলটি টানা ৩০ ম্যাচে অপরাজিত থেকেছে; একমাত্র হার এসেছে টাইব্রেকারে। অন্যদিকে কেপ ভার্দের শক্তি তাদের দলীয় সংহতি, শৃঙ্খলিত রক্ষণ এবং লড়াকু মানসিকতা। অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা ও ডিফেন্ডার রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস দলের ভরসা।
স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জানিয়েছেন, লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস সুস্থ হয়ে ফিরছেন এবং বিশ্বকাপে দলের প্রথম ম্যাচে খেলতে প্রস্তুত। তবে ইয়ামালকে পুরো ৯০ মিনিট খেলানো হবে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন তিনি। স্পেন অধিনায়ক রদ্রি বলেছেন, দলের তরুণ তারকারা বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামছে এবং তারা চাপকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে। কেপ ভার্দে কোচ পেদ্রো বাবিস্থা বারবার জোর দিয়েছেন দলীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসের ওপর। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার এটিই সেরা সুযোগ বলে মনে করেন তিনি। কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস বিশ্বাস করেন, তাদের দল ভয় না পেয়ে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলে চমক দেখানো সম্ভব। দলটির খেলোয়াড়দের মধ্যেও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার প্রবল ক্ষুধা রয়েছে।
কাগজে-কলমে স্পেন শুধু এই ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টেরই অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী। অনেক বিশ্লেষক তাদের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাব্য শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে রেখেছেন। অন্যদিকে কেপ ভার্দের মূল লক্ষ্য হবে গ্রুপপর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা এবং অন্তত একটি ঐতিহাসিক ফল অর্জন করা। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা এই গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠাই হবে তাদের জন্য বিশাল সাফল্য। স্পেনের আক্রমণভাগের গতি, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতার সামনে কেপ ভার্দেকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। তবে বিশ্বকাপ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ছোট দলের স্বপ্ন কখনো অবহেলা করা যায় না। তাই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সামনে আফ্রিকার নতুন রূপকথার নায়করা কতটা লড়াই করতে পারে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় চলমান বিশ্বকাপে অন্যতম হট ফেভারিট হিসেবে স্পেনকে গণ্য করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কাতার বিশ্বকাপের মহানায়ক লিওনেল মেসি বলে দিয়েছেন, এবার ইয়ামাল-পেদ্রিদের হাতে সোনালি ট্রফি উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কাতার বিশ্বকাপে আচমকা পতন হলেও ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের (ইউরো) শিরোপা জয় করে আবারও কক্ষপথে ফিরেছে স্পেন। এবার দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছেন স্প্যানিশ তারকারা। ২০২৪ ইউরোজয়ী স্পেন তাদের বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে অপরাজিত ছিল। লামিনে ইয়ামাল, পেদ্রির মতো উদীয়মান খেলোয়াড়রা দলের আক্রমণভাগ ও মিডফিল্ডকে অনেক শক্তিশালী করেছে। দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার আক্রমণাত্মক এবং পজেশনভিত্তিক খেলার শৈলী দিয়ে দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
১৯৩৪ সালে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলা স্পেন অনেক সাধনার পর ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়। এ পর্যন্ত ১৭ বার বিশ্বকাপে খেলা দেশটির এটিই সর্বোচ্চ সাফল্য। ইউরোপের ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর ইউরোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৯৬৪, ২০০৮, ২০১২ ও ২০২৪ সালে।
বিশ্বকাপে দুই দলের অর্জন
স্পেন
বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ: ১৭তম
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন: ২০১০
২০২২ বিশ্বকাপ: শেষ ষোলো
বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন
কেপ ভার্দে
বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ: প্রথমবার
২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলা নিশ্চিত করে
জনসংখ্যা ৬ লাখেরও কম; বিশ্বকাপে ওঠা ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি।