আজ ২৪ জুন। সংখ্যার হিসেবে ৩৯ বছরে পা রাখলেন লিওনেল মেসি। ফুটবলের নির্মম নিয়ম বলে, এই বয়সে একজন খেলোয়াড়ের গল্প শেষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা। শরীর ক্লান্ত হয়, গতি কমে যায়, স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হয়। কিন্তু মেসি যেন অন্য কোনো উপাখ্যানের চরিত্র। সময় তার শরীরে বয়সের ছাপ ফেললেও, পায়ের জাদুতে এখনো যৌবনের দীপ্তি অটুট।
বিশ্বকাপের মঞ্চে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে জন্মদিনের আগের রাতটাকে আরও রঙিন করে তুলেছেন তিনি। শুধু জয় নয়, সেই ম্যাচে তিনি ছুঁয়েছেন এমন এক উচ্চতা, যেখানে আগে কেউ পৌঁছাতে পারেনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি। ১৮ গোল নিয়ে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন মিরোস্লাভ ক্লোসা এবং মার্তাকে। ৩৯ বছরে পা দেওয়ার ঠিক আগে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারও নিজের নাম লিখেছেন সোনালি অক্ষরে।
এক সময় আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের ছোট্ট এক বালককে বলা হয়েছিল, তার উচ্চতা হয়তো স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই বালকই আজ ফুটবলের সবচেয়ে উঁচু শিখরে। দীর্ঘ পথচলায় জিতেছেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর–কী নেই তার ঝুলিতে! অথচ মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো ট্রফি নয়; বরং কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া।
মেসির ক্যারিয়ারকে আলাদা করে দেয় তার ধারাবাহিকতা। প্রজন্ম বদলেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী বদলেছে, ফুটবলের কৌশল বদলেছে। কিন্তু মেসি রয়ে গেছেন মেসিই। ২০০৬ সালে যে তরুণ প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন, ২০২৬ সালেও সেই মানুষটিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আলো। দুই দশকজুড়ে একই রকম প্রভাব ধরে রাখা কেবল প্রতিভার নয়, অসাধারণ মানসিক শক্তিরও প্রমাণ।
বিশ্বকাপে তার প্রতিটি স্পর্শ যেন ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ, সবচেয়ে বেশি মিনিট, সবচেয়ে বেশি ম্যাচসেরা পুরস্কার, সবচেয়ে বেশি গোল অবদান–রেকর্ডের তালিকা এত দীর্ঘ যে আলাদা একটি বই লেখা যায়। কিন্তু সংখ্যাগুলোও মেসির পুরো গল্প বলতে পারে না। কারণ মেসি শুধু পরিসংখ্যান নন, তিনি এক অনুভূতির নাম।
আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে তিনি জাতীয় গর্ব। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা। আর তার সমর্থকদের কাছে তিনি এক আবেগ, যার ব্যাখ্যা সংখ্যায় হয় না। যখন তিনি বল পায়ে এগিয়ে যান, তখন বয়স, ক্লান্তি কিংবা বাস্তবতার হিসাব যেন হারিয়ে যায়। মনে হয়, ফুটবল এখনো সেই শিশুটির খেলা, যে আনন্দের জন্য মাঠে নামে। ৩৯ বছরে দাঁড়িয়েও মেসি যেন প্রমাণ করে চলেছেন, মহত্ত্বের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। অনেকের কাছে এই বয়স অবসরের দ্বারপ্রান্ত, কিন্তু তার কাছে এটি আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহসই তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে।
ক্যালেন্ডার বলছে, আজ তার ৩৯তম জন্মদিন। কিন্তু ফুটবলের ক্যানভাসে তিনি এখনো চিরযৌবনের প্রতীক। রেকর্ড ভাঙছেন, ইতিহাস লিখছেন, নতুন প্রজন্মকে মুগ্ধ করছেন। তাই মেসিকে দেখে মনে হয়, কিছু মানুষ বয়স বাড়ান না–তারা শুধু কিংবদন্তিতে পরিণত হন।
শুভ জন্মদিন, লিওনেল মেসি।
ফিফা বিশ্বকাপে
* ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা- ১৭
* ইতিহাসে সর্বাধিক গোল ও অ্যাসিস্ট- ২৩
* সবচেয়ে বেশি ম্যাচে গোল করার রেকর্ড- ১৩
* সবচেয়ে বেশি জয় পাওয়া ফুটবলার- ১৮
* সর্বাধিক ম্যাচসেরা- ১২
* সবচেয়ে বেশি উদ্বোধনী গোল করার রেকর্ড- ১০
* ডি-বক্সের বাইরে থেকে সর্বাধিক গোল- ৫
* সবচেয়ে বেশি ভিন্ন আসরে গোল করা ফুটবলার- ৫
* জোড়া গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার- ৩৮ বছর
* বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার- ৩৮ বছর
* সর্বোচ্চ গোল্ডেন বল জয়: ২
* গোল্ডেন বল জয়ী সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার- ৩৫ বছর
* এক বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচসেরা পুরস্কার- ৫
* সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড- ২৮
* অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ম্যাচ- ২০
* বিশ্বকাপে সর্বাধিক মিনিট খেলার রেকর্ড- ২৩৯৩
----------------------------------------------------
* আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ১১ সর্বাধিক হ্যাটট্রিক
* বিশ্বকাপের প্রতিটি নকআউট ও গ্রুপপর্বে ম্যাচসেরা হওয়া একমাত্র ফুটবলার
* বিশ্বকাপের এক ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করা সবচেয়ে কম বয়সী এবং সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলার
* আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১২১ গোলের মালিক
* আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ২০১ খেলার রেকর্ড
* আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসে সর্বাধিক (৬১) অ্যাসিস্ট
* সর্বাধিক (৮) ব্যালন ডি অ’রজয়ী
* সর্বাধিক (৮) ফিফা দ্য বেস্ট
* বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৪ বার ম্যাচসেরা
* ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৯টি ভিন্ন ক্যালেন্ডার বছরে ৫০+ গোল করা একমাত্র ফুটবলার
* ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে এক ক্যালেন্ডার বছরে ৭টি ভিন্ন প্রতিযোগিতায় গোল করা একমাত্র ফুটবলার