ক্রিকেট যখন দুই দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে, তখন রাজনীতি সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ালে ক্ষতিটা হয় পুরো খেলাটিরই- এমনটাই মনে করেন এহসান মানি। আইসিসির সাবেক সভাপতি ও পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান সম্প্রতি দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে চলমান সংকট নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন এভাবেই। একইসঙ্গে ক্রিকেট প্রশাসনের পুরোনো দর্শনের কথা নতুন করে সামনে আনেন তিনি। মানির মতে, একসময় ক্রিকেট পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল খেলাটির স্বার্থ, রাজনীতি নয়। তিনি স্মরণ করেন জগমোহন ডালমিয়া, মাধবরাও সিন্ধিয়া ও ইন্দরজিৎ সিং বিন্দ্রার মতো প্রশাসকদের সময়ের কথা, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো একটাই প্রশ্ন মাথায় রেখে: ক্রিকেটের জন্য কী ভালো? সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো খবরের কাগজের পাঠকদের জন্য-
আপনি কি মনে করেন, বিষয়টি এখনও সমাধান করা সম্ভব? ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কি হওয়া উচিত বা হতে পারে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্রিকেটে রাজনীতি ঢোকার বিপক্ষে। জগমোহন ডালমিয়া কিংবা তার আগেও মাধবরাও সিন্ধিয়া বা ইন্দরজিৎ সিং বিন্দ্রার সময় ক্রিকেটে রাজনীতির প্রশ্নই ছিল না। তখন একটাই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল- ক্রিকেটের জন্য যা ভালো, সেটাই সবার জন্য ভালো। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত ও পাকিস্তান যদি বিশ্বকাপে একে অপরের বিপক্ষে না খেলে, তা ক্রিকেটের জন্য মোটেও ভালো নয়।
সংকট সমাধানে আপনি কী করতেন?
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে আমি সবসময় অন্য বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতাম, অন্য কারও সঙ্গে নয়। খোলাখুলি আলোচনা করলে সমস্যা বিশ্লেষণ করা যায় এবং সমাধানের পথ বের করা যায়। আইসিসিতে কিংবা পিসিবির চেয়ারম্যান হিসেবে আমার সময়েও ভারতের সঙ্গে বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আমার কখনও সমস্যা হয়নি, কারণ সমস্যা থাকলে সদস্যদের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করাই ছিল আমার দায়িত্ব।
আপনি যদি ক্ষমতায় থাকতেন, তাহলে কী করতেন?
আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে আমি অবশ্যই সমাধানের চেষ্টা করতাম। কোনো সদস্যকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিতে কেউ চাইতাম না। পিসিবি একটি অবস্থান নিয়েছে। আমি চাইতাম তারা অবস্থান না নিয়ে আলোচনায় বসুক। মানুষকে কথা বলতে হয়, হুমকি দিতে বা পদক্ষেপ নিতে নয়। তবে এটি দুই পক্ষ থেকেই হওয়া উচিত ছিল।
সত্যি বলতে, যখন জয় শাহ ও আইসিসি এই সিদ্ধান্ত (বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া) নেয়, তখন পাকিস্তান ছাড়া সবাই একমত ছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু পিসিবি মনে করেছে এটি অন্যায় বা রাজনৈতিক। তখনই বিষয়টি থামিয়ে দেওয়া উচিত ছিল এবং জয় শাহ ও মহসিন নকভির কথা বলা উচিত ছিল। আমার মনে হয়, পিসিবি হতাশা থেকেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, কারণ তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছিল।
শ্রীলঙ্কা যে পিসিবিকে বয়কট না করার অনুরোধ জানিয়েছে, সে বিষয়ে আপনার মত কী?
শ্রীলঙ্কা বিসিসিআই যা বলবে, সেটাই করবে। এটাই আজকের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। পিসিবির সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল আইসিসি চেয়ারম্যানের। আমার সময়েও অনেক সমস্যা ছিল, ডালমিয়ার সময়েও ছিল। যেমন, রবার্ট মুগাবে শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের জমি দখল করায় ইংল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের মধ্যে সমস্যা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, বড় বিষয়টি দেখুন। আমরা ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে ও রক্ষা করতে এসেছি। আপনি এতে রাজনীতি ঢোকাচ্ছেন। যদি এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সরকারের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দরকার। ভিসা না দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা বার্তা বুঝেছিল এবং পিছু হটেছিল। ইংল্যান্ড দল খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও জিম্বাবুয়ে গেলে আমি তাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম দেখানোর জন্য যে তারা নিরাপদ। আইসিসি পুরো দায়িত্ব নিচ্ছে। এ ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ বড় বার্তা দেয়। পিসিবি ও আইসিসির চেয়ারম্যানরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছেন না- জগমোহনের সময়ে এমন পরিস্থিতি কল্পনাও করা যেত না। তিনি সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে অসাধারণ ছিলেন।
আপনার কি এখনও আশা আছে যে ম্যাচটি হতে পারে?
সম্মানের সঙ্গে বলছি, বিষয়টি আবার বাংলাদেশের ইস্যুতেই ফিরে আসে, কারণ আইসিসি তাদের টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়েছে এবং পিসিবি সঙ্গে সঙ্গে অসন্তোষ জানিয়েছে। তখন আইসিসির উচিত ছিল পিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা।
কারগিলের সময় (১৯৯৯) পাকিস্তান-ভারত ক্রিকেট সাত বছরের বেশি সময় বন্ধ ছিল। আমি ভারতে গিয়েছিলাম। পি চিদাম্বরম, যশবন্ত সিং সহ অন্যদের সঙ্গে বিসিসিআইয়ের সহায়তায় দেখা করি। ভারতের সরকার ন্যায্যভাবে বলেছিল, এক বছর সময় দিতে। এরপর ২০০৪ সালে ভারত পাকিস্তান সফর করে, যা ছিল বিশাল সফল। পরে পাকিস্তানও ভারতে যায়। তাই মানুষে-মানুষে যোগাযোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমি ডালমিয়ার কাছ থেকে শিখেছি।
মহসিন নকভি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এটি কি তার জন্য কঠিন অবস্থান?
রাজনীতিবিদদের নিজেদের মন সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া উচিত। শরদ পাওয়ার ভারতের একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। সিন্ধিয়াও সরকারের অংশ ছিলেন। তখন এমন সমস্যা ছিল না। তাই আমার মনে হয়, এই ক্ষেত্রে আইসিসির উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে পিসিবির সঙ্গে কথা বলা। পিসিবি অসন্তোষ প্রকাশ করলে তারা উপেক্ষিত হয়েছিল। তারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যা ভুল। আমার মনে হয়, পিসিবিরই আইসিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত ছিল।
আমাদের হাতে এখনও সময় আছে। সবকিছু কি ঠিক করা সম্ভব?
কিছুই অসম্ভব নয়। তবে আলোচনা সঠিক পর্যায়ে হতে হবে। কে কার সঙ্গে কথা বলছে, আমি জানি না। কিন্তু চেয়ারম্যান থেকে চেয়ারম্যানের মধ্যে আলোচনা হওয়া উচিত।
বাণিজ্যিক মূল্য বেশি বলেই কি পাকিস্তান শুধু এই একটি ম্যাচ বয়কট করছে, অথচ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ বা থাইল্যান্ডে নারী ম্যাচে ভারতের সঙ্গে খেলছে?
এটি পারস্পরিক সম্মানের অভাবে নেমে আসে। কে ঠিক, কে ভুল- আমি তা বলছি না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ঘটনার কারণে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। ভারতীয় খেলোয়াড়দের পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি, পিসিবি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ট্রফি নিতে ভারতীয় দলের অস্বীকৃতি। এসব ব্যক্তিগত পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ওপর প্রভাব ফেলে। আইসিসি হস্তক্ষেপ করেনি। ক্রিকেটে ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ বলে একটি বিষয় আছে। দুই পক্ষ থেকেই রাজনীতি ক্রিকেটে ঢুকেছে, যা ক্রিকেটের ক্ষতি করছে।
এক বছর আগে আমি ইসিবির সঙ্গে আইসিসির শাসনব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে কথা বলেছিলাম, কারণ বোর্ডে কোনো স্বাধীন পরিচালক নেই, সবাই নিজ নিজ বোর্ডের প্রতিনিধি। আমি একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। তারা বলেছিল, হ্যাঁ, আমাদের এটি ঠিক করতে হবে। এরপর আর যোগাযোগ করেননি। স্পষ্টতই আইসিসির ভেতরে প্রতিরোধ ছিল। সমস্যা লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু মৌলিকভাবে সমাধান না করলে তা বারবার ফিরে আসবে।
পাকিস্তান যদি বেছে বেছে শুধু এই একটি ম্যাচ না খেলে, আইনি দিক থেকে কী হতে পারে?
একমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে খেলাটাই। পাকিস্তান বলবে ফোর্স মাজিউর- যেমন ভারত পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা বলবে, সরকারের নির্দেশ, আমরা তার বিরুদ্ধে যেতে পারি না। ভারতও একই কথা বলবে। আইনজীবীরা একে অপরের যুক্তিতে ফাঁক খুঁজবে। এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও কঠিন হয়ে যাবে, আর ক্ষতিটা হবে ক্রিকেটেরই।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তার পরেও কি ইউ-টার্ন সম্ভব?
সত্যি বলতে, আমি খুব বেশি আশা রাখি না, যদি না আলোচনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে হয়। আমি চাইতাম জয় শাহ নিজে পাকিস্তানে গিয়ে বিষয়টি মেটানোর উদ্যোগ নিতেন। আমি নিজেও ভারতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেছি। তখন ক্রীড়ামন্ত্রী সুনীল দত্তের সঙ্গে দেখা করা ছিল সত্যিই আনন্দের। তাই যদি উভয় পক্ষের সদিচ্ছা থাকে, তারা সমাধান খুঁজে পাবে। শুধু দূত পাঠালে বার্তা আদান-প্রদানই হবে। তাই চেয়ারম্যানদের সরাসরি বৈঠক করা উচিত।
অনিক/