লিওনেল মেসি ইতোমধ্যেই এই বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে পাঁচটি গোল করেছেন। আর তিনি সেটি করেছেন ম্যাচের বেশিরভাগ সময় যেন পার্কে হেঁটে বেড়ানোর মতো খেলেই।
আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ-তীব্রতার দৌড় ও প্রেসিং। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে মনোযোগ দিয়ে দেখলে দেখা যায়, মেসি বেশিরভাগ সময় হাঁটেন, ধীরে জগিং করেন কিংবা একেবারেই স্থির দাঁড়িয়ে থাকেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে মেসি মাত্র ৭ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যা গড়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ৯৪টি পদক্ষেপের সমান। তুলনায়, একই ম্যাচে তার সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজ গড়ে প্রায় ১৫০টি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবুও মেসি ম্যাচ শেষ করেছেন একটি হ্যাটট্রিক নিয়ে, যা ছিল বিশ্বকাপে তার প্রথম হ্যাটট্রিক।
প্রথম ম্যাচডের পর, মাঠের খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্ব অতিক্রম করা খেলোয়াড়দের শীর্ষ তিনজনের একজন ছিলেন মেসি। কিন্তু তিনি এমনটা কেন করেন? প্রায় ৩৯ বছর বয়সে এসে, উচ্চ-তীব্রতার ফুটবল খেলার পরিবর্তে মেসি শক্তি সঞ্চয় করে রাখেন সেই মুহূর্তগুলোর জন্য, যেগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- বিল্ড-আপ প্লে এবং আক্রমণভাগের শেষ তৃতীয়াংশে।
দৃশ্যটি কিছুটা অদ্ভুত, খেলা তার চারপাশে চলতে থাকলেও মেসি ধীর পায়ে মাঠে হাঁটছেন। তবুও এটা স্পষ্ট যে, এটি একজন প্রতিভাবানের প্রতারণাময় সেরা রূপ, যিনি নিষ্ক্রিয়তার ভান করে প্রতিপক্ষের মার্কারদের নজর এড়িয়ে যান।
এরপর তিনি সঠিক সময়টি বেছে নেন ডিফেন্ডারদের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়ার জন্য, যেখানে নিজের বিধ্বংসী ড্রিবলিং ও বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণে তাণ্ডব চালাতে পারেন। অস্ট্রিয়া ম্যাচে তার রেকর্ডগড়া ১৭তম বিশ্বকাপ গোলেও সেটিই দেখা গেছে।
ডালাস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৩৭ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে, মেসি ডান দিক থেকে বল পেয়ে মাঝমাঠ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া থিয়াগো আলমাদাকে পাস দেন। আক্রমণটি যখন অস্ট্রিয়ার গোলমুখে গতি পাচ্ছিল, তখন মেসি যেন নিজের স্কুটারে চেপে ছুটে চললেন, পল ওয়ানারকে পেছনে ফেলে সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা পেয়ে আবার জগিংয়ে ফিরে গেলেন।
ফাকুন্দো মেদিনা যখন বলটি বক্সে পাঠান, তখন আলমাদা প্রথম স্পর্শেই শট নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বলটি নিজের পেছনে যেতে দেন, যেখানে অস্ট্রিয়ান ডিফেন্ডারদের অগোচরে বক্সের কিনারায় এসে পৌঁছেছিলেন মেসি। তিনি নিখুঁতভাবে বলটি নিচের কোণে পাঠিয়ে অস্ট্রিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে দেন।
এটি সেই ধরনের গোল, যা তিনি তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার করেছেন। সেই নির্দিষ্ট দৌড়, সেই জগিং, ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা এবং গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে বল পাঠানোর দক্ষতা- সবই তিনি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত করেছেন।
মেসি নিজেই এই বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘আমি সবসময় এমন দলেই খেলেছি, যারা খেলায় নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, বার্সেলোনায়ও যেমন ছিল, এখন আর্জেন্টিনাতেও তেমন। তাই আমি খেলা থেকে নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে আমার মার্কারকে হারানোর চেষ্টা করি। এতে আমরা যখন বল পুনরুদ্ধার করি, তখন আক্রমণ শুরু করা বা পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি একটু বেশি সময় পাই এবং ভালো অবস্থানে থাকতে পারি।’
‘আমি যখন হাঁটি, তখন প্রতিপক্ষের অবস্থান বিশ্লেষণ করি, আমরা বল ছাড়া কীভাবে অবস্থান নিয়েছি তা দেখি, মার্কারের কাছ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং পাল্টা আক্রমণ শুরু করার সুযোগ তৈরি করি।’
এই কৌশল মেসিকে এই বয়সেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের সেরা সংস্করণ তুলে ধরতে সাহায্য করেছে। বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ১৩টি শট নিয়েছেন মেসিই। একই সঙ্গে এখন অবধি তিনিই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
আসলে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি এমনভাবেই দলটি সাজিয়েছেন, যাতে মেসিকে রক্ষণে খুব বেশি অবদান রাখতে না হয়। দলীয় তালিকায় মেসির অবস্থান আক্রমণের ডান পাশে দেখানো হলেও, মাঠের যেকোনো জায়গায় খেলার স্বাধীনতা রয়েছে তার। ডান দিকে তার রক্ষণাত্মক দায়িত্ব প্রায়ই সামলে নেন রদ্রিগো ডি পল ও নাহুয়েল মলিনা।
তবে এভাবে খেলা মেসির জন্য নতুন কিছু নয়। দ্য অ্যাথলেটিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ বিশ্বকাপে মেসি ৫ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হেঁটেছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার চক্রটিকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সফল সময় হিসেবে ধরা হয়, আর সেই সাফল্যের বড় অংশই এসেছে মেসির আক্রমণাত্মক গুণাবলিকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর মতো দল গঠনের মাধ্যমে। সম্ভবত এ কারণেই আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপেও তাদের শিরোপাজয়ী দলের ১৭ জন সদস্যকে ধরে রেখেছে।
তবে নকআউট পর্বে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে একজন খেলোয়াড়ের রক্ষণাত্মক অবদান না থাকা আর্জেন্টিনার জন্য ক্ষতির কারণ হবে কি না, সেটি এখনো দেখার বিষয়। কিন্তু বর্তমান ফর্ম বিবেচনায়, মেসিকে থামানোর ক্ষমতা কি আদৌ কোনো দলের আছে, যখন তিনি নিজের সেরা ফুটবলটা খেলছেন হাঁটতে হাঁটতেই?
অনিক/