বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল পিসিবির (পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড) ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানে ঝটিকা সফর করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পৌঁছে পরের দিন তিনি ফিরে আসেন। পাকিস্তানে গিয়ে তিনি পিসিবি ও আইসিসির সঙ্গে যৌথ সভা করে তার অনুরোধেই ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান খেলতে রাজি হয়েছে বলে দেশে ফিরে এসে মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করতে থাকেন। তার এ রকম বক্তব্য নিয়ে মুখরোচক গল্প দেশের ক্রিকেট পাড়ায় ভাসতে থাকে।
অনেকেই হাসাহাসি করে বলতে থাকেন, যে ব্যক্তি দূতিয়ালি করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজের দেশকে শ্রীলঙ্কায় খেলাতে কোনো দেশকে পাশে পাননি, সেখানে তার কথায় পাকিস্তান রাজি হয়ে যায় এবং আইসিসিও বিসিবির ওপর সন্তুষ্ট হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলাতে বাংলাদেশকে কোনো জরিমানা করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, এটা হাস্যকর। বুলবুলকে এত গুরুত্ব দিলে আইসিসি বিসিবির আবেদন মেনে নিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ করে দিত। বুলবুলের এ রকম অবস্থানকে দেশের ক্রিকেটের স্বার্থ ‘স্ব-বিরোধী’ বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।
এ নিয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি খবরের কাগজে প্রতিবেদনও ছাপা হয়। কিন্তু বিসিবি সভাপতি শুধু এতটুকু বলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ আয়োজনে তিনি বিরাট ভূমিকা রাখার কারণে আইসিসি খুশি হয়ে বাংলাদেশকে ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে তাদের যেকোনো একটি ইভেন্ট আয়োজন করার সুযোগ দেবে বিসিবিকে। এই বিষয়টিকেও আমিনুল ইসলাম বুলবুল তার বিশাল সাংগঠনিক এবং কুটনৈতিক সাফল্য আখ্যায়িত করে মিডিয়ায় প্রচার করেন। কিন্তু এখানেও তার এ রকম বক্তব্যকে শুভংকরের ফাঁকি বলে মন্তব্য করেছেন ক্রীড়াসংশ্লিষ্টরা।
নারী-পুরুষ মিলিয়ে বর্তমানে আইসিসি অনেকগুলো ইভেন্ট আয়োজন করে থাকে। পুরুষদের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ এবং নারীদের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি। এসব ইভেন্ট আয়োজন করতে গিয়ে কোনো কোনো বছর আইসিসি একাধিক ইভেন্টও আয়োজন করে থাকে। এটা সত্য যে বিসিবির সভাপতির কথা অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩১ সালের আগে আইসিসির ইভেন্ট আয়োজন করার সুযোগ পাবে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আইসিসির কোনো ইভেন্ট বাংলাদেশ আয়োজন করার সুযোগ পাবে?
আইসিসির মূল ইভেন্ট বলতে যা বুঝায়, অর্থাৎ যেসব ইভেন্ট নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের ব্যাপক আগ্রহ থাকে, সেই সব ইভেন্টগুলো হলো পুরুষদের ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। কিন্তু এই তিনটি ইভেন্ট আয়োজন করার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের। কারণ ২০৩১ সাল পর্যন্ত এসব ইভেন্ট আয়োজনের স্বাগতিক দেশ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। যেমন ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সহযোগী আয়োজক। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরবর্তী আসর বসবে ২০২৯ সালে ভারতে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরবর্তী দুই আসর ২০২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এবং ২০৩০ সালে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড যৌথভাবে আয়োজন করবে। বাকি থাকে ছেলেদের অনূর্ধ্ব-১৯ এবং নারীদের ওয়ানডে ও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। কিন্তু এই তিনটি ইভেন্ট নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের খুব একটা আগ্রহ থাকে না। অনেক দেশ এসব ইভেন্ট আয়োজনও করতে চায় না। অনেক সময় আইসিসি কোনো কোনো দেশকে গছিয়ে দেয়।
ছেলেদের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত ১৬ বার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাঝে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড স্বাগতিক হয়েছে তিনবার। দুইবার করে স্বাগতিক হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। একবার করে আয়োজন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নামিবিয়া-জিম্বাবুয়ে। ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত একবারও স্বাগতিক হয়নি। এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়েতে। বিসিবির সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে এই আসরের স্বাগতিক হওয়ার। এই আসরের পরবর্তী স্বাগতিক এখনো চূড়ান্ত করেনি আইসিসি। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ প্রথম এই আসর আয়োজন করেছিল।
নারীদের তিনটি আসরের মাঝে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ২০২৭ সালের আসরে নেপালকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ আয়োজন করবে। এটি আইসিসি আগেই চূড়ান্ত করে রেখেছে। বাকি থাকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরবর্তী আসর অনুষ্ঠিত হবে ২০২৯ সালে। আইসিসি এখনো স্বাগতিক করেনি। ছেলেদের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের স্বাগতিক না হলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ার। আবার নারীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ২০৩০ সালেরও স্বাগতিক হতে পারে। ২০২৮ সালের স্বাগতিক হয়েছে পাকিস্তান।
এই তিনটি আসরের কোনো একটি আসর যদি বাংলাদেশ আয়োজন করার সুযোগ পায়, সেটি কি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন হবে? বিসিবির সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর এটিকে বিসিবির সভাপতি বাংলাদেশের জনগণকে বোকা বানিয়ে শুভংকরের ফাঁকি বলে মনে করেন। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘জনগণকে বোকা বানিয়ে মিথ্যা বাহবা নিচ্ছেন। ভারতবিরোধী মনোভাব কাজে লাগিয়ে ক্রিকেটসংক্রান্ত যুক্তির বাইরে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি মানুষের সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলেছেন। উনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে ক্ষতি করেছেন, তা আগামী ৫০ বছরেও পূরণ করা সম্ভব হবে না। কেউ যদি প্ল্যান করে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্ষতি করবে, তারপরও এ রকম ক্ষতি করতে পারবে না। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলছে না, এটিই সত্য। তিনি আইসিসি তাদের ইভেন্ট আয়োজনের যে সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন সব ফালতু কথা। যেসব টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ আয়োজন করার সুযোগ পাবে, তা অনেক দেশ নিতেই চায় না। এসব ইভেন্ট আয়োজন হলে বুঝতে হবে বুলবুলের কথা শুভংকরের ফাঁকি। তিনি জনগণকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
বিসিবির সাবেক পরিচালক খন্দকার জামিলউদ্দিন বলেন, ‘বিসিবির সভাপতি স্পষ্ট করে বলেননি আমরা কোন ধরনের ইভেন্ট আয়োজন করার সুযোগ পাব। যতক্ষণ না পর্যন্ত উনি এটি ক্লিয়ার করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে এটি গুরুত্বহীন। স্রেফ একটা বক্তব্য ছাড়া আর কিছু না। যদি ছেলেদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজন করার কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে বাকি কোনো ইভেন্ট আয়োজন করার মাঝে কোনো কৃতিত্ব নেই। সবই শুভংকরের ফাঁকি।
পলাশ/অনিক/