পরিবর্তনের কথা বলে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার শাসনামলের অনেকটাই ছিল অনিয়মে ভরা। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে অন্যতম নেতৃত্বদানকারী হওয়ায় ড. মোহাম্মদ ইউনূস সরকারের খুবই প্রভাবশালী উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি দিনকে রাত, আর রাতকে দিন করেছেন। তার এই প্রভাব খুবই দৃষ্টিকটুভাবে ফুটে উঠে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর বিসিবির নির্বাচনে। যে নির্বাচন ছিল বিতর্কিত, সমালোচিত, অবৈধ হস্তক্ষেপে ভরা। আসিফ মাহমুদের এ রকম হস্তক্ষেপের কারণে ক্লাব কোটার সংগঠকদের একটি পক্ষ নির্বাচন বর্জন করেন।
অন্যদিকে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সংগঠকদের একটি পক্ষ কাউন্সিলরশিপ হারিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালতে তাদের পক্ষে রায় দিলেও পরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে সেখানে হস্তক্ষেপ করে সেই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। এ রকম অবস্থায় তাদের মাঝে যারা নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন, তারাও সরে দাঁড়ান। ফলে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে ১০ পরিচালক অনেকটা বিনা বাধাতেই পরিচালক নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচিত হলেও তারা যখন-তখন পদ হারাতে পারেন। কারণ এরা সবাই নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডহক কমিটি থেকে। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার গঠনতন্ত্রে অ্যাডহক কমিটি থেকে নির্বাচন করার কোনো বিধান নেই। ১০ পরিচালকের পদ এখন নির্ভর করছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ওপর।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব পান জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গোলরক্ষক আমিনুল হক বুলবুল।
তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পরই বিসিবির নির্বাচনের বিভিন্ন অনিয়ম, ত্রুটি-বিচ্যুতি, সরকারি হস্তক্ষেপ সামনে চলে আসতে থাকে। যেখানে দেখা যায় বিসিবির গঠনতন্ত্রের ৯ অনুচ্ছেদের ৯.১ ধারায় ক্যাটাগরি-১ থেকে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচিত ১০ পরিচালক সম্পূর্ণ অবৈধ। এরা সবাই নিজ নিজ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্য। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রণীত ও জাতীয় সংসদে অনুমোদিত গঠনতন্ত্রের স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে অ্যাডহক কমিটির কেউ নির্বাচন করতে পারবেন না। অনুচ্ছেদ ২৮.২ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অ্যাডহক কমিটির কোনো সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না।’
আসিফ মাহমুদ ক্রীড়া উপদেষ্টা হওয়ার পর দেশের সব ক্রীড়া ফেডারেশনের পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো ভেঙে অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছিলেন। বিসিবির এই ১০ পরিচালক বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটিতে স্থান পান।
তারা হলেন ঢাকা বিভাগের আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও নাজমুল আবেদীন ফাহিম, চট্টগ্রাম বিভাগের আহসান ইকবাল চৌধুরী ও আসিফ আকবর, বিভাগের খান আব্দুর রাজ্জাক ও মো. জুলফিকার খান, রাজশাহী বিভাগের মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান, রংপুর বিভাগের হাসানুজ্জামান, সিলেট বিভাগের রাহাত সামস এবং বরিশাল বিভাগের মো. শাখাওয়াত হোসেন।
অনুচ্ছেদ ২৮.২ ধারায় অ্যাডহক কমিটির কর্ম পরিধি নিয়ে আরও উল্লেখ আছে, ‘এই কমিটি ৯০ দিনের মধ্যে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন সম্পন্নের লক্ষ্যে গঠনতন্ত্র মোতাবেক নির্বাচন সম্পন্ন করিবে। নির্বাচন সম্পন্ন হইবার পর অ্যাডহক কমিটি নির্বাচিত কার্যনির্বাহী পরিষদের নিকট যথানিয়মে দায়িত্ব হস্তান্তর করিবে।’ সেখানে তারা নির্বাচন করা তো দূরের কথা, কাউন্সিলরই হতে পারেন না।
কিন্তু আসিফ মাহমুদ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে তারা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে অবৈধ্যভাবে প্রথমে কাউন্সিলর, পরে পরিচালক নির্বাচিত হন। এই সব পরিচালকদের অনেকেই প্রথমে কাউন্সিলর হতে পারেননি। কিন্তু আসিফ মাহমুদের নির্দেশে আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজে স্বাক্ষর করে অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলর মনোনীত করার জন্য চিঠি দেন। প্রথম চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন। তিনিই সব সময় স্বাক্ষর করে থাকেন।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও আসিফ আকবরকে পরিচালক করতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আবার ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করেন। ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটিতে আমিনুল ইসলাম বুলবুল প্রথমে ছিলেন না। মোহাম্মদ আশরাফুলকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে অ্যাডহক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে পরে কাউন্সিলর করা হয়। এরপর তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমে পরিচালক, পরে একইভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার যে অ্যাডহক কমিটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আসিফ আকবরের নাম ছিল না। পরে মোহাম্মদ আশরাফুলের মতো একজনকে বাদ দিয়ে আসিফ আকবরকে অ্যাডহক কমিটিতে রেখে কাউন্সিলর করা হয়। তিনিও চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচন হন।
বিসিবির নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ‘সি’ ক্যাটাগরি থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘এসব অনিয়মের কারণেই তো আমরা আদালতে গিয়েছি। তারা যে অবৈধ্যভাবে নির্বাচন করেছে এটা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। এখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উচিত হবে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করার জন্য এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।’
লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন মঈনউদ্দিন চৌধুরী কামরু। অ্যাডহক কমিটিতে না থাকায় তার কাউন্সিলরশিপ বাতিল হয়ে যায় তিনি বলেন, ‘এখানে কোর্টের রায়ের কোনো প্রয়োজনই হবে না। অ্যাডহক কমিটিতে থেকে নির্বাচন করার এখতিয়ার নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী করতে হবে। গঠনতন্ত্র তো পরিবর্তন হয়নি। তার মানে ক্ষমতার জোর করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে বের করে দেওয়া প্রয়োজন। শুধু ১০ পরিচালক নয়, সব জেলা ও বিভাগের কাউন্সিলর বাদ দেওয়া উচিত।’ সিলেট জেলা থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। পরে আমিনুল ইসলাম বুলবুল স্বাক্ষরিত চিঠি দিয়ে অ্যাডহক কমিটি থেকে নাম পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় দফা কারো নাম পাঠাননি সিলেট জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।
বর্তমানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বিসিবির নির্বাচনে কী পরিমাণ অনিয়ম আর হস্তক্ষেপ হয়েছে, তা আমার জেলার উদাহরণই যথেষ্ট। আমার নাম প্রথমে গিয়েছিল। পরে অ্যাডহক কমিটি থেকে নাম পাঠাতে বলা হলে জেলা প্রশাসক কোনো নাম পাঠাননি। কিন্তু সিলেট জেলার কাউন্সিলার শূন্য থাকেনি। গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছেমতো নির্বাচন করা হয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উচিত হবে এদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।’ এ ব্যাপারে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক দৌলতুজ্জামান খান বলেন, ‘এনএসসি আইন, বিধি বিধান এবং স্থানীয় ও জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার যে গঠনতন্ত্র আছে তার বাইরে যাবে না।’ ১০ জন পরিচালক গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ এটা যেহেতু আমি জানি না। না জেনে আমি আসলে জবাব দিতে পারবো না। এতে আমার ভুল হয়ে যেতে পারে।’ বিসিবির নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন সু্প্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি মোহাম্মদ হোসাইন। গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে তারা কিভাবে নির্বাচন করলেন জানাতে চেয়ে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ফোর রিসিভ করেননি।