ফিফা বিশ্বকাপ মানেই শুধু চ্যাম্পিয়ন আর সুপারস্টারদের গল্প নয়, বরং আন্ডারডগ বা পিছিয়ে থাকা দলগুলোর রূপকথাও এর অন্যতম সৌন্দর্য। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অনেক অখ্যাত মুখও এই মঞ্চে এসে জ্বলে উঠেছেন। ছোট দল হলেও অনেকে ফেভারিটদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই অবিশ্বাস্য জয়গুলো বিশ্বকাপের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এমন কিছু ম্যাচের গল্প নিয়েই এই প্রতিবেদন-
যুক্তরাষ্ট্র ১: ০ ইংল্যান্ড
১৯৫০ বিশ্বকাপ
১৯৫০ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র ১-০ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেই দলটা সৌখিন খেলোয়াড়ে ভরা ছিল। একজন ছিলেন পিয়ন, একজন শববাহী গাড়িচালক, একজন থালাবাসন ধোয়ার কর্মী ও একজন পেইন্ট স্ট্রিপার। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে আসা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই ফলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন হিসেবে বিবেচিত হয়। ম্যাচের একমাত্র গোলটি আসে ৩৮ মিনিটে। গোলটি করেন নিউইয়র্কের এক হোটেলের হাইতিয়ান থালাবাসন ধোয়ার কর্মী ও ফরোয়ার্ড জো গেটজেনস।
পশ্চিম জার্মানি ৩: ২ হাঙ্গেরি
১৯৫৪ বিশ্বকাপ
এটি ছিল ‘মিরাকল অব বার্ন’। নাৎসি শাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উঠতে থাকা পশ্চিম জার্মানি ফাইনালে হারিয়ে দেয় ‘ম্যাজিকাল ম্যাজিয়ার্স’ হাঙ্গেরিকে। নান্দর হিদেকুতি, সান্দর কোকসিস, জোল্টান চিবর ও ফেরেঙ্ক পুসকাসের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া হাঙ্গেরি দলকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দল বলা হতো। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে তারা কেবল বার্নের এই ফাইনাল ম্যাচটিই হেরেছিল ও নিজেদের ৫০টি ম্যাচের মধ্যে ৪২টিতে জিতেছিল।
এর আগে গ্রুপপর্বে জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারিয়েছিল হাঙ্গেরি। ফাইনালেও অষ্টম মিনিটের মধ্যেই তারা ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। তবে পশ্চিম জার্মানি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় এবং ১৮ মিনিটের মধ্যে মাক্স মরলক ও হেলমুট রানের গোলে সমতা ফেরে।
হাঙ্গেরি আক্রমণাত্মক খেলে গেলেও জার্মান গোলরক্ষক টনি টুরেক বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করেন। এরপর ৮৪ মিনিটে হেলমুট রান ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে গোল করে জার্মানির অবিশ্বাস্য জয় নিশ্চিত করেন। এই জয়টি ছিল যুগান্তকারী। জার্মান ইতিহাসবিদ জোয়াকিম ফেস্ট লিখেছেন, ‘এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানদের ওপর চেপে বসা সমস্ত বোঝা থেকে এক ধরনের মুক্তি। ১৯৫৪ সালের ৪ জুলাই নির্দিষ্ট কিছু দিক থেকে জার্মান প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা দিবস।’
উত্তর কোরিয়া ১: ০ ইতালি
১৯৬৬ বিশ্বকাপ
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই চমক সৃষ্টি করে পিয়ংইয়ংয়ে দারুণ অভ্যর্থনা পেয়েছিল উত্তর কোরিয়ার ফুটবলাররা। ‘চলিমা’ (একটি পৌরাণিক ডানাওয়ালা ঘোড়া যা সাধারণ মানুষের পক্ষে আরোহণ করা অসম্ভব, যা দেশটির বিপ্লবী উদ্দীপনার প্রতীক) তাদের শেষ গ্রুপ ম্যাচে ঐতিহ্যবাহী ইতালিকে ১-০ গোলে পরাজিত করে। হাফ-টাইমের তিন মিনিট আগে জয়সূচক গোলটি করেন তৎকালীন সেনা করপোরাল পার্ক দো-ইক। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে পার্ক বলেছিলেন, ‘সেদিন আমি শিখেছিলাম ফুটবল মানে শুধু জয়ী হওয়া নয়। যখন আমি গোলটি করেছিলাম, মিডলসব্রোর মানুষ আমাদের মনে স্থান দিয়েছিল। আমি শিখেছিলাম যে ফুটবল খেলা কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি করতে পারে এবং শান্তি প্রচার করতে পারে।’
মিডলসব্রোর বাসিন্দারা সত্যিই এই এশিয়ান দলটির প্রেমে পড়েছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইউসেবিওর পর্তুগালের কাছে ৫-৩ গোলে দলের পরাজয় দেখতে তাদের প্রায় ৩০০০ সমর্থক লিভারপুলে ভ্রমণ করেছিলেন।
উত্তর আয়ারল্যান্ড ১: ০ স্পেন
১৯৮২ বিশ্বকাপ
উত্তর আয়ারল্যান্ডের মিডফিল্ডার টমি ক্যাসিডি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ফাইনাল বাঁশিতে আমরা শুরুতে উদযাপন করিনি। আমরা কেবল বিস্ময় নিয়ে প্রায় ১০ সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।’ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনকারী তৎকালীন ক্ষুদ্রতম দেশটি স্বাগতিক স্পেনের বিপক্ষে কানায় কানায় পূর্ণ মেস্তায়া স্টেডিয়ামে এক অঘটন ঘটায়। স্প্যানিশরা দারুণভাবে শুরু করেছিল ও কয়েকটি সেটপিস থেকে গোলের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে প্রথমার্ধ গোলশূন্য ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর কয়েক মিনিট পর, বিলি হ্যামিল্টন ডান উইংয়ে চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে একটি ক্রস পাঠান। স্প্যানিশ গোলরক্ষক লুইস আরকোনাডা বলটি কেবল আটকে দিলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। বক্সে ওত পেতে থাকা গ্যারি আর্মস্ট্রং বলটি জোরালো শটে দুই ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে পাঠান।
সেনেগাল ১: ০ ফ্রান্স
২০০২ বিশ্বকাপ
তৎকালীন লিগ ওয়ানের দল লেন্সের নিয়মিত খেলোয়াড় পাপা বুবা ডিওপের ৩০ মিনিটের একটি গোল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেনেগালকে এক অত্যাশ্চর্য জয় এনে দেয়। ডেভিড ত্রেজেগে এবং থিয়েরি অঁরি যথাক্রমে পোস্টে এবং ক্রসবারে আঘাত করলেও ফরাসিরা গোল করতে ব্যর্থ হয়। কোচ ব্রুনো মেতসু ৪-১-৩-২ কম্বিনেশনে দল খেলিয়েছিলেন, যেখানে অধিনায়ক আলিও সিসে ব্যাক ফোরের সামনে সুইপার হিসেবে খেলেন।
সেনেগালের রক্ষণভাগ মাঝমাঠের ঠিক পেছনে থেকে ওপরে এসে চাপ সৃষ্টি করায় ফ্রান্সের আক্রমণভাগ মাঝমাঠে জায়গা পায়নি ও তাদের স্ট্রাইকারদের প্রতিপক্ষের অর্ধে নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছিল। লেন্সের আরেক খেলোয়াড় এল হাদজি দিউফ ছিলেন সেনেগালের আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি। তিনি নিজের গতি এবং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে ফ্রান্সের প্রবীণ সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটি মার্সেল ডেসাইলি এবং ফ্রাঙ্ক লেবোফকে তটস্থ করে তোলেন। তার ক্রস থেকেই বুবা ডিওপ গোলটি করেছিলেন।
নেদারল্যান্ডস ৫: ১ স্পেন
২০১৪ বিশ্বকাপ
নিজেদের অনন্য পজিশন-ভিত্তিক পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে ২০০৮ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল স্পেন। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় তারা প্রথম বিশ্বকাপ জেতে এবং ২০১২ সালে আরও একটি ইউরোপীয় মুকুট নিজেদের করে নেয়। ডিফেন্ডিং বিশ্ব ও ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্পেন ২০১৪ বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট দল হিসেবে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু নিজেদের প্রথম ম্যাচেই নেদারল্যান্ডসের কাছে তারা ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়, যারা তখন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১৫ নম্বরে ছিল। রবিন ফন পার্সি ও আরিয়েন রবেন দুটি করে গোল করেন। এতে স্পেন ৫-১ গোলে পরাজিত হয় এবং পরে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয়। এটি ডাচদের জন্য এক রকম প্রতিশোধের ম্যাচও ছিল। কারণ ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে তারা স্পেনের কাছে হেরেছিল।
স্পেনের বিপর্যয় এখানেই শেষ হয়নি; পরের ম্যাচে চিলির কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় তারা। ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ছিটকে যায় আগেভাগেই।
পর্তুগাল ০: ১ মরক্কো
২০২২ বিশ্বকাপ
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর রূপকথা সবাইকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। প্রথম আফ্রিকান এবং আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠেছিল তারা। এই পথে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারা তারা। একমাত্র গোলটি করেন ইউসেফ এন-নেসিরি।
আটলাস লায়ন্সরা ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে শেষ চারে জায়গা করে নেয়। এর আগে যা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র (১৯৩০) ও দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২)।
পর্তুগালের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক জয়ের আগে মরক্কো গ্রুপপর্বে বেলজিয়ামকে স্তব্ধ করেছিল এবং শেষ ষোলোতে স্পেনকে টাইব্রেকারে বিদায় করেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালটি অবশ্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছিল। কারণ মরক্কো এমন এক পর্তুগাল দলের মুখোমুখি হয়েছিল যার নেতৃত্বে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। মরক্কোর বিপক্ষে হেরে চোখের জলে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল রোনালদোকে।