ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে চা শ্রমিক অলকা রবিদাসের। মৌলভীবাজারের দেওড়াছড়া চা বাগানে বসবাস তার। সাংসারিক কাজ সামলে হাতে তুলে নেন মাটির ঘরের কোণে রাখা কাঁধে ঝোলানোর থলে। তারপর বেরিয়ে পড়েন চা বাগানের পথ ধরে। শিশিরভেজা পাতায় পা ছুঁয়ে যায়, আর কাঁধের থলে ধীরে ধীরে ভারী হয় সময়ের সঙ্গে। যেখানে জমে ওঠে শ্রম আর জীবন।
পর্যটনের শহর মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ সবুজ চা বাগান যেন রং, ঘ্রাণ আর গল্পের এক অপূর্ব মিশ্রণ। এখানকার প্রতিটি চা পাতায় লুকিয়ে আছে অলকা রবিদাসের মতো চা শ্রমিকদের শ্রম, সময় আর শত বছরের ঐতিহ্য। তাই তো হাজারো পর্যটক আসেন চা বাগান দেখতে, অভিজ্ঞতা নিতে। পাশাপাশি চায়ের আস্বাদনে ডুবে যান তাদের অনেকেই।
দিনের পর দিন রোদে-পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যারা পাতার পর পাতা তুলে আনেন, সেই চা শিল্পের শিল্পী চা শ্রমিকদের জীবনের গল্প ততটা আনন্দদায়ক নয়। এখানে আছে সবুজে মোড়া স্বপ্নময় এক জগৎ। তাদের শ্রমে তৈরি হয় যে চা, তা শুধু স্বাদে নয়, হৃদয়ের গভীরেও ছাপ রেখে যায়। কিন্তু সেই চা কাপ অবধি আসা প্রতিটি পাতার পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতার গল্প। কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি ভুলে জীবনের চলার পথে হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ- সবখানেই এক কাপ চা নিয়ে আসে গভীর তৃপ্তি।
চা শিল্পে জড়িতরা জানান, দিনের শুরুতেই চা পাতা সংগ্রহে মাঠে নামেন মূলত নারী শ্রমিকরা। কাঁধে ঝোলানো থলে, হাতে দ্রুত চলা আঙুল, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে তারা। স্বল্প মজুরি, কঠিন পরিশ্রম আর সীমিত সুযোগ, চা শ্রমিকদের জীবনযাপন এখনো সংগ্রামে ভরা। পাতা সংগ্রহের পর তা নিয়ে যাওয়া হয় কারখানায়। সেখানে শুকানো, গুটানো, রোস্টিংসহ নানা ধাপে তৈরি হয় পরিচিত সেই চা। দেওড়াছড়া চা বাগানের চা শ্রমিক অলকা রবিদাসের কণ্ঠে ছিল আক্ষেপের সুর। তিনি বলেন, ‘ভোর হইতেই বাগানে যাই, রোদ-বৃষ্টি যাই আসুক, পাতা তুলতেই হয়। এই পাতাগুলা আমার মতো শ্রমিকদের হাত দিয়া তোলা। পরে এই পাতা চায়ে রূপ নেয়, ভাবতেই ভালো লাগে। তবে যদি আরেকটু ভালো মাইনে পেতাম, জীবনটা সহজ হতো।’
কমলগঞ্জের মিরতিংগা চা বাগানের চা শ্রমিক জয়ন্তী কুর্মি বলেন, এত কষ্ট করি, কিন্তু মাইনে (মজুরি) খুবই কম। তবু চা বাগানই আমাদের জীবন। যারা বেড়াতে আসেন, তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন, ছবি তোলেন, ভালোই লাগে। কিন্তু আমাদের কষ্টটা কয়জন বোঝে?
সম্প্রতি চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে খবরের কাগজের প্রতিনিধি কথা বলেন কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে। তাদের একজন ঢাকা থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী দেবাশীষ সরকার। তিনি বলেন, প্রতিদিনই চায়ের কাপে চুমুক দিই। কিন্তু এই প্রথম চা বাগানে এলাম। এত সুন্দর পরিবেশ, তবে চা শ্রমিকদের কাজ খুব কঠিন, তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যেত না। তারা সত্যিই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
পাশে দাঁড়ানো বেসরকারি চাকরিজীবী রওনক জামান বলেন, প্রথমবার এসেছি মৌলভীবাজারে। এখানকার মানুষদের জীবন সংগ্রাম দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। এই সৌন্দর্যের পেছনে যে এত পরিশ্রম, তা কল্পনাও করিনি। এখানে আসার পর বুঝতে পারি, আমাদের প্রতিদিনের এক কাপ চায়ের পেছনে কত মানুষের শ্রম আর গল্প লুকিয়ে আছে। এখন থেকে চা শুধু স্বাদে নয়, শ্রদ্ধায়ও উপভোগ করব।
শ্রীমঙ্গলের ভানুগাছ রোডে কথা হয় খুলনা থেকে আসা একদল পর্যটকদের সঙ্গে। তারা ছোট চায়ের দোকানের বসে গল্প করছিলেন। তাদের একজন মাহিনুল হাসান। তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গলে চা খাওয়ার অভিজ্ঞতা মানেই যেন প্রকৃতির কোলে বসে এক কাপ ঘ্রাণে-গন্ধে ভরা স্বপ্নের চা। চারপাশে সবুজ চা-বাগান, এসবের মাঝে হাতে ধরা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কাপ। যেন মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়।
কথার শেষে আরেকজন বলে উঠলেন, প্রথম চুমুকেই বোঝা যায়, কেন শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় ‘চায়ের রাজধানী’। চায়ের স্বাদ এখানে শুধু জিভেই নয়, মনে গাঁথা থাকবে অনেক দিন।
সপরিবারে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক নিশাত রহমান বলেন, আমরা যে চা খাই, সেই চায়ের পেছনে কত মানুষের শ্রম জড়িয়ে আছে তা বাগানে এসে বুঝলাম।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল ফটকে কথা ঢাকা থেকে আসা পর্যটক দম্পতি সোহাগ ইসলাম ও নীতু চৌধুরীর সঙ্গে। তারা জানান, এখানকার চা শুধু পানীয় নয়, এটি সংস্কৃতির অংশ। পর্যটকদের কাছে চা এখন অভিজ্ঞতার নাম।
চা কাপ হাতে যখন আমরা গল্প করি, তখন মনে রাখা দরকার এই চায়ের প্রতিটি ফোঁটায় মিশে আছে মৌলভীবাজারের সবুজ বাগান, চা শ্রমিক আর দীর্ঘ ইতিহাসের নির্যাস, বলছিলেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ইকো ট্যুর গাইড সাজু মারছিয়াং।
দিনশেষে ক্লান্ত পা দুটি অলকা রবিদাসকে ফিরিয়ে আনে সেই মাটির ঘরে। কাঁধ থেকে থলেটা নামিয়ে শরীরজুড়ে জমে থাকা ক্লান্তি যেন ঘরের দেয়ালে গা লাগিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। তবু সেই ক্লান্ত চোখে জ্বলজ্বল করে প্রশান্তির আলো। এটাই তার দিন, এটাই তার জীবন। যেই জীবনে প্রতিটি চা কাপে মিশে থাকে তারও একটু স্বপ্ন, একটু নীরব ভালোবাসা।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের কুইচৌ প্রদেশের থোংরেন শহরে রবিবার শুরু হয়েছে বর্ণাঢ্য ড্রাগন বোট শোভাযাত্রা। আসন্ন এই নৌকা বাইচ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য উৎসবের আগাম আমেজ নিয়ে এসেছে। রোববার সকালে একটি স্থানীয় ঘাটে শোভাযাত্রার সূচনা হয়। এ সময় প্রায় ২০০টি নৌকা বিভিন্ন বিন্যাসে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে ছিল ঐতিহ্যবাহী চীনা প্রমোদতরী, বাঁশের ভেলা, ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন বোট এবং স্থানীয় বিশেষ প্রতিযোগিতা নিউলং-এর নৌকা। শোভাযাত্রার পথটি সিনচিয়াং নদীর প্রধান মনোরম অঞ্চল অতিক্রম করে, যা থোংরেন শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণকে সংযুক্ত করেছে।
প্রমোদতরীগুলোতে শিল্পীরা দর্শকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য পরিবেশন করেন। ঘন্টা ও ঢাকের শব্দের মধ্যে নাবিকরা একে অপরের ওপর জল ছিটিয়ে দেন। এই বিশেষ রীতির মাধ্যমে তারা পরস্পরের প্রতি শীতলতা, প্রাণবন্ততা ও আশীর্বাদ পৌঁছে দেন। ড্রাগন বোট উৎসব যা তুয়ানউ উৎসব নামেও পরিচিত। এটি প্রাচীন চীনের যুদ্ধরত রাজ্যকালের (৪৭৫-২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) কবি ছু ইউয়ান স্মরণে উদযাপিত এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। চীনা চন্দ্র পঞ্জিকার পঞ্চম মাসের পঞ্চম দিনে পালিত এ উৎসব যা এ বছরের ১৯ জুন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথমবার গ্রেট ওয়াল দেখার অভিজ্ঞতা কোনো ভ্রমণ নয় এ যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা। বেইজিং থেকে ট্রেনে করে বাদালিং পৌঁছে যখন প্রথম সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম, পায়ের নিচের প্রতিটি পাথর যেন ফিসফিস করে বলছিল ‘আমি দুই হাজার বছর ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।’ ২০২৪ সালের শীতের সেই সকালে, কুয়াশার চাদর সরতে সরতে যখন প্রাচীরের বাঁকগুলো দৃশ্যমান হলো, মনে হলো যেন এক বিশাল ড্রাগন, পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাংলাদেশের লালবাগ কেল্লা বা মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে ইতিহাসের যে অনুভূতি পেতাম, এখানে তার চেয়েও বেশি কিছু ঘটল মনে হলো। ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় নয়, ইতিহাস ছোঁয়া যায়, ইতিহাসের গায়ে হাত বোলানো যায়। আর ঠিক এই অনুভূতিটাই চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটনের মূল শক্তি। এখানে ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়; এ যেন একটি সভ্যতার আত্মার সঙ্গে কথোপকথন।
সংস্কৃতি যেখানে রক্তের মতো প্রবহমান
চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কোনো জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে বন্দী করা যায় না, কারণ এই সংস্কৃতি এখনো জীবিত; কখনো রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে, বা সকালের পার্কে তাইচি করতে থাকা বৃদ্ধের হাতের মুদ্রায়, অথবা বসন্ত উৎসবের আগের রাতে আকাশভাঙা আতশবাজিতে। আমি যখন নানজিংয়ে পড়তে আসি, প্রথম কয়েক মাসে আমার মনে হতো এ যেন এক অদ্ভুত সময়যাত্রা। এক পাশে আকাশছোঁয়া কাঁচের দালান, আরেক পাশে কয়েকশ বছরের পুরনো মন্দির, যেখানে প্রতিদিন সকালে ধূপ জ্বলে। চীনের সংস্কৃতি এখানেই অনন্য আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীনত্বের এই মিশেলটাই তার পর্যটনের প্রাণ।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন আরও চারটি স্থানকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে; বেইজিং সেন্ট্রাল অ্যাক্সিস, জিংমাই পর্বতের প্রাচীন চা বন, শিয়া রাজবংশের সমাধি, এবং প্রাচীন সমুদ্রবাণিজ্য কেন্দ্র ছুয়ানজৌ। এখন পর্যন্ত চীনের ৬০ টি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান আছে, যার প্রতিটিই একেকটি জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী। আর চীন এই ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষণ করছে না, ৬৫টি জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান এবং ২০০টির বেশি সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক পর্যটন রুট তৈরি করেছে। ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সুসংহত তদারকির আওতায় আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, অর্থাৎ সংস্কৃতি এখন শুধু আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ।
যে শহরগুলো প্রাচীন সময়কে মনে করিয়ে দেয়
রাজধানী বেইজিং
বেইজিং যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। ফরবিডেন সিটি সেই প্রকাণ্ড প্রাসাদ, যেখানে পাঁচশো বছর ধরে ২৪ জন সম্রাট রাজত্ব করেছেন । এখানে ঢুকলে মনে হয় সময় থমকে গেছে। ১৮০ একরজুড়ে ছড়ানো এই প্রাসাদ নগরীর প্রতিটি লাল দরজা, প্রতিটি সোনালি ছাদের কারুকার্য যেন একেকটি গল্প বলে। আমি যখন প্রথম বার সেখানে গেলাম, এক চীনা দাদু আমার পাশে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘তুমি জানো, এই প্রাসাদের প্রতিটি ইটের নিচে একটা করে গল্প চাপা আছে।’ কথাটা নিছক কাব্যিক নয় এখানকার প্রতিটি কোণে ইতিহাস জমে আছে পলিমাটির মতো।
ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্ক।
শিয়ান: মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা সৈন্যবাহিনী
টেরাকোটা আর্মি নিয়ে যতই পড়েছি, কিছুই আমাকে প্রস্তুত করতে পারেনি সেই দৃশ্যের জন্য। ১৯৭৪ সালে এক কৃষক কুয়া খুঁড়তে গিয়ে যে আবিষ্কার করেছিলেন, তা আজ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঘটনা। হাজার হাজার মাটির সৈন্য, ঘোড়া, রথ প্রতিটি মুখভঙ্গি আলাদা, প্রতিটি বর্মের নকশা ভিন্ন। সম্রাট ছিন শি হুয়াং (Qin Shi Huang) মৃত্যুর পর নিজের সুরক্ষায় এদের তৈরি করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরও মানুষের জীবন থাকে। তাই পরলোকে তাকে পাহারা দেওয়া এবং সেখানেও নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি এই বিশাল মাটির সেনাবাহিনী তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি যখন প্রদর্শনী কক্ষের ব্যালকনি থেকে নিচে তাকালাম, সেই সারিবদ্ধ সৈন্যদের দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল মনে হলো তারা যেন দুই হাজার বছর ধরে শুধু শত্রুকেই খুঁজছে।
সাংহাই: যেখানে গতকাল আর আগামীকাল একসঙ্গে দাঁড়িয়ে
সাংহাইয়ের বান্ডে দাঁড়িয়ে হুয়াংপু নদীর ওপারে পুডং-এর আকাশছোঁয়া টাওয়ারগুলোর দিকে তাকালে যে ছবিটা চোখে পড়ে, সেটা যেন কল্পবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ পৃথিবী। অথচ পেছনে তাকালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের পুরনো বাড়িগুলো, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সাংহাইয়ের স্মৃতির নিদর্শন। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই সাংহাইয়ের ম্যাজিক। বন্ধুরা মিলে রাতের বেলা বান্ডে হাঁটতে হাঁটতে আইসক্রিম খাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম বাংলাদেশের পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোর সঙ্গে এই দ্যুতিময় নগরীর কত অমিল, অথচ দুই জায়গাতেই ইতিহাস আর আধুনিকতা পাশাপাশি বাস করছে।
হাংঝো ও ওয়েস্ট লেক
ওয়েস্ট লেকের সকাল যেন চীনা জলরঙের পেইন্টিং থেকে উঠে আসা কোনো দৃশ্য। কুয়াশার ভেতর দিয়ে উইলো গাছের ঝুলন্ত শাখা, দূরে প্যাগোডার ছায়া, পানিতে রাজহাঁসের ভেসে বেড়ানো; সব মিলিয়ে মনে হয় বাস্তবতা আর কবিতার সীমারেখা মুছে গেছে। হাংঝো শহরটা চীনের সাংস্কৃতিক রোমান্টিকতার প্রতীক। মার্কো পোলো একে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও চমৎকার শহর।’ আমি যখন লেকের পাশে বসে গ্রিন টি-তে চুমুক দিচ্ছিলাম, এক পাশে বাঁশের বাঁশির সুর ভেসে আসছিল মুহূর্তটা এতটাই নিখুঁত ছিল যে ফোনে ছবি তুলতেও ইচ্ছে করছিল না। চোখ দিয়েই ধরে রাখতে চাচ্ছিলাম সবটা।
ঝাংজিয়াজিয়ে
ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কে ঢুকে প্রথম যে অনুভূতি হয়, তা হলো ‘এটা কি সত্যি?’ আকাশের দিকে উঠে যাওয়া বিশাল বিশাল বেলেপাথরের স্তম্ভ, যেন কোনো দৈত্য, প্রকৃতির খেলাঘর থেকে এগুলো মাটিতে পুঁতে রেখেছে। জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার ভাসমান পাহাড়গুলো এই স্তম্ভগুলো থেকেই অনুপ্রাণিত। আমি যখন কাঁচের স্কাইওয়াকের ওপর দাঁড়িয়ে হাজার ফুট নিচে বনের দিকে তাকালাম, তখন বাংলাদেশের সিলেটের চা বাগান বা বান্দরবানের পাহাড়ের কথা মনে পড়ল প্রকৃতি যে কত বিচিত্র রূপ নিতে পারে, তা শুধু চীন ঘুরলেই বোঝা যায়।
ভ্রমণের স্বাদ: ট্রেন, খাবার আর উৎসব
চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক ২০২৫ সালে ৪.৬ বিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে, যা পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই নেটওয়ার্ক ৬০,০০০ কিলোমিটারে প্রসারিত করার পরিকল্পনা আছে। ভাবুন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে খুলনা যেতে যে সময় লাগে, এখানে তার চেয়ে কম সময়ে বেইজিং থেকে সাংহাই পৌঁছে যাওয়া যায়। ট্রেনের নিঃশব্দ গতি, পরিচ্ছন্নতা, আর নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর সংস্কৃতি প্রতিটি ভ্রমণকে নিখুঁত আরামদায়ক করে তোলে।
আর খাবারের গল্প না বললে চীনের ভ্রমণকথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বেইজিংয়ের রাস্তার ধারে গরম গরম জিয়াওজি (ডাম্পলিং) খেতে খেতে মনে হলো ঢাকার চকবাজারের সিঙাড়া-পুরির কথা। সিচুয়ানের ঝাল খাবার খেয়ে চোখে পানি এলেও স্বাদ এতই অপ্রতিরোধ্য যে থামানো যায় না। সাংহাইয়ের শেংজিয়ানবাও, ভাজা স্টিমড বান যেন বাংলাদেশের ভাপা পিঠার চীনা সংস্করণ। আর চায়ের কথা তো আলাদা করে বলতে হয়, বাংলাদেশ যেমন চায়ের দেশ, চীনও তেমনই চা সংস্কৃতির জননী। লংজিং চায়ের প্রথম চুমুকটিতে যেন হাংঝোয়ের পাহাড়ি সকালটাই গিলে ফেলছিলাম।
উৎসবের সময় চীন হয়ে ওঠে এক ভিন্ন গ্রহ। আমার দেখা প্রথম চীনা নববর্ষ ছিল এক চোখ-ধাঁধানো অভিজ্ঞতা। পুরো শহর লাল লণ্ঠনে সেজে ওঠে। আকাশে আতশবাজির ফুলঝুরি, রাস্তায় ড্রাগন নাচ, বাচ্চাদের হাতে লাল খাম বাংলাদেশের ঈদের আনন্দের সঙ্গে এর কত মিল! দুই সংস্কৃতির উৎসবপ্রিয়তার এই মিলটা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। মনে হয়েছে, উৎসবের ভাষা আসলে সার্বজনীন।
সংরক্ষণ আর আধুনিকতার সেতুবন্ধন
চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ঐতিহ্য সংরক্ষণ আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন একই পথে হাঁটতে পারে। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত চারটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনের প্রাকৃতিক ও মিশ্র ঐতিহ্য স্থানগুলোর সংরক্ষণের মান বিশ্ব গড়ের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো। ৯০ শতাংশের বেশি ঐতিহ্য স্থানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংরক্ষণ কর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়, অর্থাৎ পর্যটন এখানে স্থানীয় অর্থনীতিরও চালিকাশক্তি।
২০২৫ সালে চীন ৬.৫ বিলিয়ন অভ্যন্তরীণ পর্যটন ট্রিপ এবং ৬৮ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটকের রেকর্ড গড়েছ। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে চীন হবে বিশ্বের এক নম্বর পর্যটন অর্থনীতি। ভিসামুক্ত নীতির আওতায় ২০২৫ সালে ৩০ মিলিয়নের বেশি বিদেশি পর্যটক চীন ভ্রমণ করেছেন যা আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। কিন্তু চীনের পর্যটন এখন শুধু গ্রেট ওয়াল বা ফরবিডেন সিটির মতো বড় গন্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন হাই-স্পিড রেল রুট ছোট শহর আর গ্রামীণ অঞ্চলগুলোকে পর্যটনের মানচিত্রে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের বসন্ত উৎসবের নয় দিনে প্রায় ৫৯৬ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে ৯৫ মিলিয়ন বেশি। জাদুঘর, ঐতিহাসিক পাড়া, লোকজ উৎসব, পারফর্মিং আর্ট সব মিলিয়ে চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটন এখন পরিপূর্ণ এক বাস্তুসংস্থান।
বাংলাদেশ আর চীনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নতুন নয়। বর্তমানে পদ্মা সেতু থেকে কর্ণফুলী টানেল চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় অংশীদার। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে সেতু তৈরি হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে মজবুত। বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে চীনে থেকে আমি প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখছি। চীনাদের কাছে পরিবারের গুরুত্ব, বড়দের প্রতি সম্মান, খাবারের প্রতি ভালোবাসা এগুলো আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে মাঝে মাঝে ভুলেই যাই আমি ভিনদেশে আছি। অথচ পার্থক্যগুলোও সমান আকর্ষণীয় তাদের সময়ানুবর্তিতা, কর্মনিষ্ঠা, আর দলগত কাজের প্রতি নিষ্ঠা আমাদের সমাজের জন্যও বড় শিক্ষা। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন চীনের মতো বাংলাদেশও তার ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে। আমাদের সুন্দরবন, পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁ এসব স্থানের পর্যটন সম্ভাবনা অফুরান। চীনের কাছ থেকে শেখার বিষয় হলো পর্যটন মানেই শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁ নয়, পর্যটন হলো সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন, স্থানীয় অর্থনীতির ইঞ্জিন, আর জাতির আত্মপরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার মাধ্যম।
শেষ কথা
গ্রেট ওয়াল থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। পাহাড়ের গায়ে প্রাচীরের শেষ আলোটুকু আঁকাবাঁকা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছিল এই প্রাচীর যেন চীনেরই প্রতিচ্ছবি দীর্ঘ, সহিষ্ণু, স্থিতধী, আর রহস্যে মোড়া। যে পর্যটক শুধু ছবি তুলতে আসে, সে প্রাচীরের পাথর দেখে ফেরে। কিন্তু যে ভ্রমণকারী ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতে চায়, সে বোঝে এই পাথরগুলো শুধু সীমানা গড়েনি, এগুলো একটা সভ্যতার মেরুদণ্ড। চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটন আমাকে শিখিয়েছে যে ভ্রমণ মানে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয় ভ্রমণ হলো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা, অন্য সংস্কৃতির আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা। বাংলাদেশি হিসেবে আমি বুঝেছি, আমাদের সংস্কৃতি আর চীনের সংস্কৃতির মধ্যে যে মিলগুলো আছে, সেগুলোই দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রকৃত ভিত্তি। আর পার্থক্যগুলো? সেগুলো শেখার জানালা নতুন করে ভাবতে শেখায়, নতুন চোখে দেখতে শেখায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, নানচিং ইউনিভার্সিটি অফ ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শহর ছোংছিং মিউনিসিপালিটি এক ব্যস্ত পাহাড়ি শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে এক বৃহৎ আকারের সমন্বিত আলোকসজ্জার পরিকল্পনা চালু করা হয়ছে। এর লক্ষ্য আরও ঝলমলে রাতের নগরদৃশ্য তৈরি করে পর্যটন ও ভোগব্যয় বৃদ্ধি করা। শহরটি তার খাড়া ভূপ্রকৃতি, দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ ভবন ও নদীতে উঁচু সেতুর জন্য পরিচিত, যা পরিকল্পনাকারীদের জন্য একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুউচ্চ কাঠামো দিয়ে তারা আরও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নগর আকাশরেখা গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছেন। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৬ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকাকে কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে উজ্জ্বলতা, রঙ এবং আলো সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এতে এক চমকপ্রদ রাতের দৃশ্য তৈরির চিন্তা রয়েছে। ছোংছিং মিউনিসিপাল আরবান লাইটিং সেন্টারের উপ-পরিচালক ছেন ইউয়ানখে বলেন, ‘এই গ্রাফিকটি উজ্জ্বলতার অংশকে তুলে ধরছে। আগে ভবনগুলো নিজেদের মতো করে আলোর ব্যবস্থা পরিচালনা করত। এখন আমরা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি।’ আলোকসজ্জার নকশা কেবল অনুভূমিক নয়, বরং উল্লম্বভাবেও বিস্তৃত, যা শহরের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিকে পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে। ছোংছিং মিউনিসিপাল আরবান ম্যানেজমেন্ট ব্যুরোর লাইটিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপ-পরিচালক লি হুয়াতোং বলেন, ‘কেন্দ্রীয় এলাকায় শহরের আলোর আভা একটি পটভূমি তৈরি করে, যেখানে সড়ক আলোকসজ্জা মূল স্রোত এবং ভবনগুলোর আলোকসজ্জা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ফলে একটি সামগ্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।’ শহর প্রশাসন এই সমন্বিত আলোকসজ্জা প্রকল্প উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব সময়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে—ঠিক কখন এবং কীভাবে আলো জ্বলবে বা নিভবে। কর্তৃপক্ষ বলছে, ছোংছিং তার প্রিয় রাতের দৃশ্যকে পর্যটন ও ভোগব্যয়ের চালিকাশক্তি হিসেবে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চায়। ছোংছিং টিভির কনটেন্ট প্রোডাকশন সেন্টারের উপ-পরিচালক কুও পেইচুন বলেন, ‘গত বছর ছোংছিংয়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। ভোক্তা ব্যয় পৌঁছেছে ৫৫৮.৫ বিলিয়ন ইউয়ানে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি।’ সূত্র: সিএমজি বাংলা
ইউরোপের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত নর্ডিক দেশসমূহ পৃথিবীর অন্যতম শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং বাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নয়, বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনমানের জন্যও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
বিশ্ব সুখ সূচক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নর্ডিক দেশগুলো নিয়মিতভাবে শীর্ষস্থান অধিকার করে। এখানকার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে বিশ্বাস করে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের এক অনন্য মডেল গড়ে তুলেছে।
নরওয়ে: ফিয়র্ডের দেশ
নরওয়ে তার অপরূপ ফিয়র্ড, সুউচ্চ পাহাড়, জলপ্রপাত এবং দীর্ঘ সমুদ্র উপকূলের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। হাজার হাজার বছর আগে হিমবাহের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া গভীর উপসাগর বা ফিয়র্ডগুলো আজও পর্যটকদের বিস্ময়ে অভিভূত করে।
রাজধানী অসলো আধুনিক নগর পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সুপরিচিত। অন্যদিকে লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জ, গেইরাঙ্গার ফিয়র্ড এবং ট্রোমসো অঞ্চলে দেখা মিলতে পারে প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময় নর্দার্ন লাইটসের। এসব স্থান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
সুইডেন: উদ্ভাবন ও প্রকৃতির মেলবন্ধন
সুইডেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বৃহত্তম দেশ। বিস্তীর্ণ বনভূমি, অসংখ্য হ্রদ এবং আধুনিক নগর সভ্যতার এক চমৎকার সমন্বয় এখানে দেখা যায়।
রাজধানী স্টকহোম উত্তর ইউরোপের অন্যতম সুন্দর শহর হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য দ্বীপের ওপর গড়ে ওঠা এই শহরকে অনেকেই “উত্তরের ভেনিস” বলে অভিহিত করেন।
প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব জীবনধারা এবং উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে সুইডেন বিশ্বের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণা, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।
ফিনল্যান্ড: হাজার হ্রদের দেশ
ফিনল্যান্ডকে বলা হয় হাজার হ্রদের দেশ। বাস্তবে দেশটিতে রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি হ্রদ।
গ্রীষ্মকালে সবুজ বনভূমি ও হ্রদের অপরূপ সৌন্দর্য যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি শীতকালে তুষারে ঢাকা প্রাকৃতিক দৃশ্য এক ভিন্ন জগতের অনুভূতি তৈরি করে।
রাজধানী হেলসিঙ্কি আধুনিক স্থাপত্য, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার জন্য পরিচিত। উত্তরাঞ্চলের ল্যাপল্যান্ডে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক নর্দার্ন লাইটস দেখতে আসেন।
বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও ফিনল্যান্ড সুপরিচিত। পাশাপাশি প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ডেনমার্ক: সুখী মানুষের দেশ
ডেনমার্ককে প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর একটি বলা হয়। নাগরিকদের উচ্চ জীবনমান, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাজধানী কোপেনহেগেন তার রঙিন নৌবন্দর, সাইকেল সংস্কৃতি এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার জন্য বিখ্যাত।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডেনমার্ক বিশ্বের অগ্রগামী দেশগুলোর অন্যতম। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতির বিকাশেও দেশটির ভূমিকা প্রশংসিত।
আইসল্যান্ড: আগুন ও বরফের দেশ
আইসল্যান্ড প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। আগ্নেয়গিরি, হিমবাহ, গেইসার, উষ্ণ প্রস্রবণ এবং জলপ্রপাতের অপূর্ব সমন্বয় দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে।
রাজধানী রেইকিয়াভিক পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরাঞ্চলীয় রাজধানী শহর। এখানে প্রকৃতির অপরিসীম শক্তি এবং আধুনিক জীবনযাত্রা পাশাপাশি অবস্থান করছে।
আইসল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর প্রাকৃতিক পরিবেশও পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
কেন নর্ডিক দেশগুলো বিশ্বে অনন্য?
নর্ডিক দেশগুলোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য-
উন্নত এবং বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচের শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশবান্ধব নীতি ও টেকসই উন্নয়ন দুর্নীতির নিম্ন হার নারী-পুরুষের সমতা শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ
এখানকার মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসেন। বনভূমিতে হাঁটা, হ্রদের ধারে সময় কাটানো, মাছ ধরা, স্কিইং কিংবা পরিবার নিয়ে কটেজে অবকাশ যাপন তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ভবিষ্যতের জন্য একটি অনুপ্রেরণা
নর্ডিক দেশগুলো শুধু পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় নয়; মানবিক উন্নয়ন, সুশাসন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিশ্বের জন্য এক অনুকরণীয় উদাহরণ।
আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় কীভাবে পরিবেশ, মানুষ এবং উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, তার সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই অঞ্চল। উন্নয়ন যে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত- নর্ডিক দেশগুলো তারই বাস্তব উদাহরণ।
বরফে আচ্ছাদিত পাহাড়, সবুজ বনভূমি, নীল হ্রদ, মনোমুগ্ধকর ফিয়র্ড এবং উন্নত জীবনব্যবস্থার সমন্বয়ে নর্ডিক অঞ্চল সত্যিই পৃথিবীর এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম। একবার যে এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীবনধারা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়, তার হৃদয়ে নর্ডিক দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ স্থান তৈরি হয়ে যায়।
গদখালী ফুলের গ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফুলচাষ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ছবি এআই
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এই জেলায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, শতবর্ষী স্থাপনা, ধর্মীয় নিদর্শন, সবুজ উদ্যান এবং বিনোদনকেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু বা একক ভ্রমণ—সব ধরনের পর্যটকের জন্যই যশোরে রয়েছে আকর্ষণীয় অনেক গন্তব্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক যশোর জেলার কয়েকটি ভ্রমণযোগ্য স্থানের কথা।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান, সাগরদাঁড়ি বাংলা সাহিত্যের অমর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান। এখানে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, জাদুঘর এবং কপোতাক্ষ নদের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
কপোতাক্ষ নদ যশোরের ঐতিহাসিক নদীগুলোর অন্যতম। নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
যশোর আইটি পার্ক আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র। প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।
যশোর কালেক্টরেট পার্ক শহরের মাঝখানে অবস্থিত পরিচ্ছন্ন ও সবুজ পার্ক। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য উপযোগী।
যশোর পৌর পার্ক শিশু ও পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় একটি পার্ক।
যশোর ইনস্টিটিউট ঔপনিবেশিক আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয়।
মনিরামপুর জমিদার বাড়ি প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। অতীতের জমিদারি ঐতিহ্যের সাক্ষী এই ভবন।
নওয়াপাড়া নদীবন্দর ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত ব্যস্ত নদীবন্দর। নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।
ভৈরব নদ যশোরের অন্যতম প্রধান নদী। নদীতীরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।
চাঁচড়া শিব মন্দির প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা। এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব রয়েছে।
বেনাপোল জিরো পয়েন্ট বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। সীমান্ত এলাকার ব্যস্ততা ও পরিবেশ দেখার সুযোগ রয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকা দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
গদখালী ফুলের গ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফুলচাষ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ফুলে ভরা ক্ষেতের সৌন্দর্য দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ঝিকরগাছা ফুলবাগান এলাকা বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ ও রঙিন প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য জনপ্রিয়।
বকচরা ইকো পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য উপযুক্ত একটি বিনোদনকেন্দ্র। সবুজ পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, যশোর মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়।
শামস-উল-হুদা স্টেডিয়াম যশোরের প্রধান ক্রীড়া ভেন্যু। ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে পরিচিত স্থান।
চৌগাছা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ অতীতের জমিদারি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
কেশবপুরের প্রাচীন মন্দিরসমূহ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন কয়েকটি মন্দির নিয়ে গড়ে উঠেছে এই এলাকা।
খাজুরা গ্রামাঞ্চল গ্রামীণ জীবন, সবুজ প্রকৃতি এবং শান্ত পরিবেশ উপভোগের জন্য আদর্শ স্থান।