ভরদুপুর থেকে প্রস্তুতি নিতে নিতে বেলা গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেল। তবুও যেতে হবে খেজুরগাছ তলায়। আর কারও জন্য দেরি নয়। বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদল করে দুই মোটরবাইকে চারজন। গন্তব্য কুশিয়ারচর। জায়গাটা মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায়। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ বরাবরের মতো এবারও গতানুগতিক পথে না গিয়ে, সাভার নামাবাজার ব্রিজ পার হয়ে ফোর্ডনগর, আড়ালিয়া, খড়ারচরের মায়াবী সড়ক পথটাকেই বেছে নিই। এতে প্রায় ১৩ কিলোমিটার অতিরিক্ত রাইড করতে হলেও, ভ্রমণে মিলবে অনেক কিছুরই বাড়তি পাওনা।
আঁকাবাঁকা সরু চকচকে পিচঢালা সড়কে ছুটছি। দুই পাশে বিস্তর ফসলি জমি। সরিষা ফুলের ম-ম ঘ্রাণ। জমি থেকে সড়কের উচ্চতা কোথাও কোথাও ১৪ থেকে ১৫ ফিট। সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার। মোচড় ঘুরতে গিয়ে নয়া আতঙ্ক অটোর সঙ্গে সংঘর্ষ হলে তো আর কথাই নেই। সোজা গিয়ে খাদে। যে কারণে হেরে গলায় মন খুলে গান ধরতেও পারছিলাম না। তা যাই হোক শীতের সন্ধ্যায় রাইডটা জমে উঠতেছে বেশ।
যেতে যেতে কাংশা ব্রিজ পার হয়ে সিঙ্গাইর বাজারে ব্রেক। গরম গরম ভাপা পিঠা আর হাঁসের সেদ্ধ ডিম একচোট পেটে পুরে আবারও বাইক স্টার্ট। ধীরে ধীরে আতঙ্কশূন্য (ব্যাটারিচালিত যানবাহন) হয়ে পড়ল পথঘাট। সেই সুযোগে ফাঁকা সড়কে মারো টান। মারতে মারতে বাস্তা বাজার হয়ে তেলতেলে নয়া পাটুয়ারিয়া সড়কে। প্রশস্ত সড়ক পেয়ে স্পিড কিছুটা বাড়িয়ে দিই।
যেতে যেতে মিতোরা ব্রিজের আগে একটি টি স্টলের নাম দেখেই মারলাম ব্রেক। এক মগ মালাই চায়ের সঙ্গে এক টুকরো নানরুটি চুবিয়ে খেতেই মনটা ভরে গেল। এরপর স্টলের পাশেই থাকা বাহারি মসলার মিষ্টি পান মুখে পুরে সোজা টান। মোটরবাইক ট্যুরে এই একটা মজা। ইচ্ছা হলেই যেথায় খুশি সেথায় থামিয়ে, ভরপুর সেই জায়গাটার মজা লুফে নিতে পারা।
যতই এগোতে থাকি ততই অন্ধকার আর নির্জনতা গ্রাস করতে থাকে। কনকনে শীতে মোগো লাহান পাগল ছাড়া কি কেউ বাইরে থাকে! হা হা হা। জগতে কত পদের পাগল আছে। তা দেখতে হলে আমরার মতন রাতবিরাইতে, লেপের ওম ছাইড়া বাইরে বাইরুইয়া পরবাইন।
ছুটতে ছুটতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুটঘুটে অন্ধকার এক ব্রিজে থামতে হলো। তিন-চারজনকে আসতে দেখে ভাবলাম ডাকাত কি না। তারাও এমনটা ভেবেছিল কি না কে জানে। সামনাসামনি হতেই মৃদু আলাপচারিতায় পথের নিশানা পরখ করে নেওয়ার ছলে দু-চারটা ছবি তুলে নিই। ভেতরে ভেতরে ভয়ে মরি। ওপরে দিয়া ভাব মেরে দ্রুত ভাগি। ভাগতে ভাগতে খেজুর মিঠাই খ্যাত ঝিটকার নয়নাভিরাম সড়কে চলছি। চলতে চলতে পদ্মাপাড়ের কুশিয়ারচর গ্রামে পৌঁছাই।
রাত তখন ১০টার ওপরে। এত রাতে কোথায় তাঁবু বানাই। অগত্যা ভ্রমণসঙ্গী জসিমের বিয়াইন বাড়ি আশ্রয় নিই। আমাদের পেয়ে পৌষের হাড় কাঁপানো শীতে বিয়াইনও বেশ খুশি। জম্পেশ এক আড্ডা জমিয়ে ঘুমের দেশে যাই হারিয়ে। রসের নেশায় খুব ভোরেই ঘুম ভাঙে। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে চলে যাই খেজুরগাছ তলায়। ওস হতে রক্ষা পেতে তাঁবু টানাই। ততক্ষণে রসের হাঁড়ি মাটিতে। ইচ্ছামতো চলে খেজুর রস পান। আহ কী অমৃত স্বাদ।
হ্যামোকে কিছুক্ষণ দোল খাওয়ার পরে আবারও শুরু। সঙ্গে এবার হাতে ভাজা মুড়ি। কাঁচা রসে মুড়ি ভিজিয়ে, আগে কখনো এমনটা খাওয়া হয়নি। এই জনমে আরও কত কিছুইত খাওয়া বাকি। খাওয়ার লোভে ডুবে থাকলে, দুনিয়ার সৌন্দর্য অদেখাই রয়ে যাবে। যাই এবার কুশিয়ারচর গ্রামটা হেঁটে বেড়াই। হাঁটতে হাঁটতে বিশাল এক খেজুরবাগানের দেখা পাই। বাগানটা দেখে বেশ উৎফুল্ল হই। বিলুপ্তপ্রায় খেজুরগাছের আধিক্য দেখে যারপরনাই খুশি হই। গ্রামবাসী জানাল নতুন করে আবারও খেজুরগাছ বপন করা হয়। নিশ্চিত এটা একটা সুসংবাদ।
চরজুড়ে প্রচুর সবজি ও সরিষা ফুলের খেত। ফুটন্ত সরিষা ফুলের ওপর সকালের সোনারোদ ঝিকিমিকি খেলে। গ্রামের প্রতিটা বাড়িই যেন একেকটি খামার। গরু, বকরি, হাঁস, মুরগি সবই পোষা হয়। কোনো কোনো বাড়ির পুকুরে মাছ চাষও করা হয়। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে চোখের সামনে দোয়ানো গরুর দুধ, সদ্য বানানো খেজুর মিঠাই খেতেও ভুল করি না। গ্রামের মানুষগুলোও বেশ আন্তরিক।
ঘুরতে ঘুরতে আবারও ফিরে আসি তাঁবুতে। ইতোমধ্যে কুয়াশা কেটে সূর্যের ঝাঁঝালো তেজ। চোখ পড়ে পশ্চিম দিকে। দৃষ্টির সীমানার মধ্যেই সুনসান নীরব একখণ্ড ভূমি পানির ওপর মাথা উঁচু করে আছে। স্থানীয় জনৈক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করতেই বলে ওটা ফরিদপুরে পড়ছে। মনে মনে বলি বেটার কি মাথা খারাপ হইছেনি। কই মানিকগঞ্জ আর কোথায় ফরিদপুর। পরক্ষণেই বি.বাড়িয়া জেলার কথা মনে পড়ে গেল। যার সীমানা নারায়ণগঞ্জ লাগোয়া। তা বাপু যেই জেলাতেই হোক, যেতেই হবে আমাদের।
নদী ঘাটে নৌকা আছে কিন্তু মাঝি নেই। একদল দাঙ্গালকে উসকে দিলাম মাঝি খুঁজে আনার জন্য। সেই ফুরসতে রসে ভেজা চিতই পিঠা গোগ্রাসে উজাড় করি। দাঙ্গাল পোলাপান নৌকার মাঝিকে না পাইয়া, মালিককেই সঙ্গে করে নিয়ে এল। তাহলে আর দেরি কেন। ভাসিয়ে দেওয়া হলো ইঞ্জিন নৌকা। পদ্মার বুকে ভেসে ভেসে উঠি গিয়ে সেই চরে। ওয়াও! কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই। নেই কোনো গবাদিপশুর পাল। প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে সদ্য জেগে উঠা চর। চারদিকে থই থই পানি, মাঝখানে এক টুকরো জমি। সেই জমিরই মাঝে আবার নীলাভ পানির জলাধার। অনেকটা প্রাকৃতিক লেক সাদৃশ্য। চরের তীরে পদ্মা নদীর ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। সব মিলিয়ে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভর করে আছে।
সময়ের অভাবে পুরো চরটা হাঁটা হয়নি। তবে পৌষের শীতেও টলটলে স্বচ্ছ পানিতে ডুব দিতে কার্পণ্য করিনি। বের হলাম রসের খুঁজে। আর বাড়তি পাওনা হিসেবে ভ্রমণ ঝুলিতে যোগ হলো, অচেনা এক নয়নাভিরাম চরের সৌন্দর্য। সব মিলিয়ে কুশিয়ারচর ভ্রমণের ষোলকলায় বুঁদ হয়ে ফেরার পথ ধরি।
চলুন ঘুরে আসি: ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জগামী বাসে-কারে কিংবা মোটরবাইকে। কার-বাইক হলে ইচ্ছামতো সড়কে যাওয়া যাবে।
থাকা-খাওয়া: পূর্বপরিচিত কেউ থাকলে সুবিধা হবে। নয়তো পদ্মার পাড়ে তাঁবু টাঙিয়ে রাতযাপনসহ নিজেরা রান্নাবান্না করেও খাওয়া যাবে।
