প্যারিসের রাস্তায় হেঁটে যাওয়া আর পাঁচজন সাধারণ নাগরিকের মতোই সাদামাঠা চেহারা। মাথার উপর ছাদ ও দুবেলা খাওয়ার মতো সঙ্গতি রয়েছে তার। তবুও কপালে জুটেছে বিশ্বের ‘সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ’-এর খেতাব।
ফরাসি নাগরিক জেরম কেয়ারভিলের (Jérôme Kerviel) ঘাড়ে ঝুলছে বিপুল অংকের ঋণের বোঝা। সেই ঋণের পরিমাণ পৃথিবীর বহু ধনকুবেরের উপার্জিত মোট সম্পদের চেয়েও বেশি।
আর্থিক তছরুপের দায়ে জ়েরমের ঘাড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো (৬৩ হাজার ৫০০ কোটি বাংলাদেশি টাকা) দেনার খাঁড়া ঝুলছে। তার এই আর্থিক কেলেঙ্কারি আংশিক প্রভাব ফেলেছিল বিশ্ব অর্থনীতিতেও।
এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা বৃহত্তম আর্থিক ট্রেডিং কেলেঙ্কারিগুলির মধ্যে একটি হলো জেরমের এই কেলেঙ্কারি।
১৯৭৭ সালে ফ্রান্সের ব্রিটানির একটি ছোট শহরে খুবই সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন জেরম। তার মা ছিলেন কেশসজ্জা শিল্পী এবং বাবা কামার। ছোট থেকেই লেখাপড়ায় তুখোড় ছিলেন জ়েরম। লিয়ঁর লুম্যিয়ের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর হন।
পড়াশোনা শেষ করার পর ২০০০ সালে ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম ব্যাঙ্ক সোসিয়েট জেনারেল ব্যাঙ্কের জুনিয়র ট্রেডার হিসাবে কাজ শুরু করেন তিনি। অল্প দিনের মধ্যেই জেরমের দক্ষতা নজরে আসে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের। ২০০৫ সালে তাকে ব্যাঙ্কের অত্যাধুনিক ট্রেডিং ইউনিট ডেল্টা ওয়ানে নিযুক্ত করা হয়। এই দপ্তর শেয়ার ট্রেডিং, অ্যালগরিদম এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল। তার মাসিক বেতন ছিল ৫৪ হাজার ৭০০ ইউরো।
প্রযুক্তি ও ট্রেডিংয়ে চমৎকার দক্ষতা দেখে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জুনিয়র ট্রেডার হওয়া সত্ত্বেও জেরমকে লাখ লাখ ডলার লেনদেনের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সেই জ্ঞান এবং দক্ষতার অপব্যবহার করেছিলেন এই ব্যাঙ্কার। ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খুঁজে নিজের ব্যবসায়িক লাভের অঙ্ক কষতে শুরু করেন তিনি।
ব্যাঙ্কের মূলধন ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ব্যাঙ্কের সিস্টেমের সহায়তায় অফসেটিং লেনদেন শুরু করেন। অফসেট লেনদেন হলো একটি কৌশল, যেখানে কোনো ভাল শেয়ার বা ট্রেডিংয়ের বিপরীতমুখী লেনদেন করা হয়, যাতে এর প্রভাব নিরপেক্ষ হয়।
ধরা যাক, কেউ কোনো সংস্থার ১০০টি শেয়ার কিনলেন। তিনি সেই ১০০টি শেয়ার বিক্রি করে অফসেট করতে পারেন।
এক পর্যায়ে জেরম বাজারে পাঁচ হাজার কোটি ইউরো বিনিয়োগ করেন। সেই অঙ্কটা ছিল সোসিয়েট জেনারেলের বাজার মূলধনের চেয়েও বেশি। তিনি নিচে নিচে এক বছরেই আনুমানিক সাত হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যবসা করেন বলে পরে জানা যায়। এতে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তাকে বেশ প্রশংসা করেছিলেন।
২০০৮ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বব্যাপী আর্থিক সঙ্কট দেখা দেওয়ার পরই ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। সোসিয়েট জেনারেলকে যে ডুবিয়ে দিয়েছেন এই ব্যাঙ্কেরই প্রিয়পাত্র জেরম তা ধরা পড়ে যায়। যার ফলে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করতে বাধ্য হয় ব্যাঙ্ক। তখনই ফাঁস হয় কেলেঙ্কারি।
প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো তছরুপের অভিযোগ ওঠে জেরমের বিরুদ্ধে। ব্যাঙ্কের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশ্বাসের অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং কম্পিউটার সিস্টেমের অননুমোদিত ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
জেরমের দাবি ছিল, ব্যাঙ্ক তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন ছিল।
পরে ২০১০ সালে ফরাসি আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে সেই সাজা কমিয়ে তিন বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ এবং তছরুপের সমপরিমাণ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে তাকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ঋণী মানুষ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
মাত্র পাঁচ মাস কারাভোগের পর ২০১৪ সালে ইলেকট্রনিক নজরদারির শর্তে মুক্তি দেওয়া হয় তাকে। অর্থাৎ, তার ফোন ও ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে নজরদারি চালানো হবে।
২০১৬ সালে দেশটির শ্রম আদালত এক রায়ে জানায়, তাকে বাস্তব এবং গুরুতর কারণ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়েছে।
ফ্রান্সের শীর্ষ আদালত পরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো পরিশোধের রায় বাতিল করে। আদালত উল্লেখ করে, সোসিয়েট জেনারেলও এই জালিয়াতির অংশীদার। তাদের নজরদারিতে ফাঁক ছিল।
পরে, সমাজে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে এবং কর্পোরেট লোভ ও আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন জেরম। রোম থেকে প্যারিস পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করেন তিনি।
সাজা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। বর্তমানে আইটি পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন তিনি। সূত্র: আনন্দবাজার
অমিয়/