বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে আবহমান ঐতিহ্যের সাক্ষী হাতপাখা। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের সহজলভ্যতার কারণে হাতপাখার কদর অনেকটাই কমে গেছে। তীব্র গরমে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত তখন সামান্য হাতপাখার শীতল বাতাসের জাদুকরী ছোঁয়ায় দেহে আসে প্রশান্তি।
লোডশেডিং হলে গরমে স্বস্তি পেতে আজকাল চার্জার ফ্যানের প্রচলন বেড়েছে। যার ফলে নগরাঞ্চলে এখন হাতপাখার ব্যবহার দেখা যায় না বললেই চলে। তবু গ্রামীণ সমাজে হাতপাখার ব্যবহার একবারে নেই–তা কিন্তু নয়। শহরের অনেক মানুষের কাছে হাতপাখা হয়েছে শৌখিন বস্তু। অনেকে নকশা করা হাতের তৈরি হাতপাখা ঘরে সাজিয়ে রাখেন। কারণ, হাতপাখার নকশায় গ্রামবাংলার লোকচিত্র ফুটে ওঠে, যা দেখতে বেশ মনোমুগ্ধকর। গ্রামের মা, দাদি-নানিরা পাখা বানাতেন যাতে ফুটে উঠত তাদের রুচি, মনন ও চিন্তাচেতনার শৈল্পিক প্রকাশ। এদিক থেকে সৌন্দর্যের বিচারে এগিয়ে আছে নকশি পাখা। সুতা দিয়েই পাখার গায়ে পাখি, ফুল, লতাপাতা কিংবা ভালোবাসার মানুষের নাম অথবা ভালোবাসার চিহ্ন ফুটিয়ে তোলা হয়।
হাতপাখা তৈরির অন্যতম উপাদান হলো কাপড়, সুপারি গাছের খোল, তালপাতা, রংমিশ্রিত বাঁশের কাঠি, সুই, সুতা ইত্যাদি। হাতপাখার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে তা ছিল অনেক প্রাচীন। প্রায় তিন হাজার বছর আগে হাতপাখার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। প্রাচীন গ্রিক বা রোমানদের রাজপ্রাসাদে ময়ূর পালক বা রেশমি কাপড় দিয়ে বড় করে ঝুলানো পাখা বানানো হতো, যা দড়ি টেনে টেনে দুজন লোক দিন-রাত বাতাস করত সিংহাসনে। মুঘল বা নবাবি আমলেও টানা পাখার প্রচলন ছিল। তখনকার সে পাখাগুলো ছিল বেশ বড় আর ওজনে অনেক ভারী। দিন দিন ব্যবহার সহজ করা ও কায়িক শ্রম কমানোর লক্ষ্য হাতপাখা এসে যায় মানুষের হাতের মুঠোয়। গ্রামের বাড়ির গৃহস্থ বা কর্তাব্যক্তি গরমের সময় দুপুরে খেতে বসলে স্ত্রীরা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করত। সারা দিন কাজের শেষে বিছানায় ঘুমাতে গেলেও বাতাস করত স্ত্রী বা মায়েরা।
আরো পড়ুন: আত্মভোলা ছিলেন আইনস্টাইন
তালের পাখা বানাতে তালের ডালসহ পাতা একসঙ্গে ব্যবহার হতো। তবে তালপাতার হাতপাখা আবার ঘুরানো যায় না। তীব্র গরমের সময় বাড়ির উঠানে বসে অথবা কোনো গাছতলায় শুয়ে হাতপাখার বাতাসের অনুভূতি আধুনিক শহরের মানুষ জানতে পারবে না কখনো।
হাতপাখা নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গান ও কবিতাও। ‘তোমার হাতপাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে, আরও কিছু সময় তুমি থাকো আমার পাশে’ এ গান শোনেননি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে গরমকাল আসা মানেই হাতপাখার কদর বেড়ে যাওয়া।
এখন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাতপাখা বিলুপ্তির পথে। এক যুগ আগেও গ্রামবাংলার উপজেলায় হাতপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে, বৈদ্যুতিক পাখার সুবাদে এর প্রচলন এখন নেই বললেই চলে। হাতপাখা গ্রামীণ মানুষের জীবনের ইতিকথা তুলে ধরে, সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরে, মাটি ও মানুষের সংগ্রামের কথা বলে, লোককথা আর কবিতার কথা বলে। পহেলা বৈশাখ বা চৈত্র সংক্রান্তিসহ বিভিন্ন মেলায় হাতপাখার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে।
তারেক/
.jpg)