ছুটির দিন। শীতের মিষ্টি বিকেল। পুরোনো প্রাঙ্গণে নতুন আয়োজন। বইমেলার প্রথম দিন। মেলায় ঢুকব। শাহবাগের কাছাকাছি আসতেই দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে মানুষের ভিড়। রিকশা ও গাড়ির ছোট্ট জটলা। সেই পুরোনো দৃশ্য। প্রতিবছর দেখে আসছি। মেট্রোর নিচের সড়কে দুই দিকেই মানুষের চলাচল। পায়ে হাঁটার ছোট্ট জনস্রোত বইমেলার দিকে ধাবমান। বাঁদিকের ফুটপাথ দিয়ে যারা যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে ত্রস্তভাব। বোঝাই যায়, মেলায় ঢুকবেন তারা। আমিও টিএসসির উল্টোদিকের প্রবেশপথ দিয়ে মেলায় ঢুকব। চারুকলার সামনে চোখে পড়ল চুড়ির পসরা নিয়ে বসেছেন চুড়িওয়ালিরা। একটু পাশেই একটা দোকানে মেয়েদের বাহারি জিনিসের পসরা। চায়ের টংদোকানগুলোও সরগরম হয়ে আছে। চলছে দু-চারজন মিলে চা-পান আর আড্ডা। ফেব্রুয়ারির বইমেলা শুরু হলে এই পুরো এলাকা নারী-পুরুষ-শিশুর পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে। আজ ঠিক ততটা দেখা গেল না। তবে ছুটির দিনের আবহ টের পাওয়া গেল।
টিএসসির উল্টো দিকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢোকার গেটটা খুব সংকীর্ণ। একজন একজন করে ঢুকতে হয়। খুব একটা ভিড় নেই। তবে অনেক মানুষ- নারী-পুরুষ মেলায় ঢুকছেন। যুগল কিছু দম্পতি ও তরুণ-তরুণীকে দেখলাম। বেড়াতে আসার মেজাজে ঢুকছেন মেলায়। কিন্তু ঢুকতে গিয়ে দেখলাম, আর্চওয়ে চালু হয়নি। তবে পুলিশ আছে, সামনে পাহারায়। তাদের মধ্যে নিরাপত্তা রক্ষার চাপ নেই।
খুব সহজে ঢুকে গেলাম সোহরাওয়ার্দীর মূল মেলা প্রাঙ্গণে। ঢুকতেই চোখে পড়ল এক সারিতে বেশ কয়েকটি প্যাভিলিয়ন। পর পর স্থান পেয়েছে শোভা প্রকাশ, মাওলা ব্রাদার্স, ইউপিএল, প্রথমা, আগামী, অবসর ও অ্যাডর্ন। এই প্যাভিলিয়নগুলো পুরো প্রস্তুত হয়েই বই বিক্রিতে নেমে পড়েছে। তাদের কর্মীরা পাঠকদের বই এগিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায়।
ইউপিএল আমাদের অন্যতম অভিজাত প্রকাশনী। প্রথম দিনে তারা মেলায় এনেছে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন ইন্ডিয়া’ বইটির বঙ্গানুবাদ- ‘ভারতের রাজনৈতিক দল’। প্রথম দিনে সব বই পৌঁছবে না জানাই ছিল। কিন্তু আগামী এনেছে ৩৫টি বই। তারা সব মিলিয়ে মেলায় ৭০টির মতো বই আনবে। আগামীর নতুন বইগুলোর মধ্যে একটা রয়্যাল সাইজের সাক্ষাৎকারের সংকলন চোখে পড়ল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক শিমুল সালাহউদ্দিন। বইটিতে ১৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার আছে। দেখা হলো অ্যাডর্নের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসাইনের সঙ্গে। ‘প্রথম দিনের মেলা কেমন হচ্ছে’ জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘মানুষের আনাগোনা দেখছি। অন্য বছরগুলোতে উদ্বোধনী দিনে মানুষ খুব একটা ঢুকতে পারত না। এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা সংক্ষিপ্ত হওয়ায় মানুষ ঢুকছে।’ অ্যাডর্ন প্রথম দিনেই ১০টি নতুন বই এনেছে। প্রথমাতে দেখলাম ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অগ্রন্থিত চিঠিপত্রের সংকলিত নতুন বই।
প্রকাশকরা যেমন নতুন বই এনেছেন, তেমনি অনেক স্টলের কাজ সম্পন্ন হয়নি। স্টলের বাইরের কাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু চলছে ভেতরের কাজ। মেলার পরিবেশ সেদিক থেকে এখনো সুন্দর হয়ে ওঠেনি। চারদিকে ইট-কাঠ-বালুর স্তূপ। সব স্টলের সামনে যাওয়াও যাচ্ছিল না। নাক-মুখ ঢেকে যাচ্ছিল ধুলায়। লক্ষ করলাম, ইট-বালু বিছিয়ে এবড়োখেবড়ো মাঠকে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। কিন্তু পানি ছিটায়নি। প্রথম দিন বলেই হয়তো এমনটা দেখলাম।
আট বছর বয়সের খুদে পাঠক সূর্য লক্ষ্মীবাজার থেকে মেলায় এসেছে বাবা দিলীপ চন্দ্র দাস এবং মা ও বড় বোনের সঙ্গে। হাতে একটা বইয়ের ব্যাগ। দুটি বই কিনেছে সে। দুটিই বিজ্ঞানের বই। প্রতিবছরই সে বইমেলায় আসে এবং প্রথম দিনই আসে। এরপর আরও কয়েক দিন আসবে। সব ধরনের বই পড়তে ভালোবাসে সূর্য। মোহাম্মদপুর থেকে মুন্নী ও ফারাজানা নামের দুই বান্ধবীকে দেখলাম পরস্পরের ছবি তুলছে একটা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে। মেলায় ছবি তোলাতেই তাদের আনন্দ। দুজন দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন কোর্স করছে। বই কিনবে, তবে পরে। এখন বই নেড়েচেড়ে পছন্দ করে যাচ্ছে।
মেলায় এবার ৮৫টি নতুন প্রকাশনীকে প্রথমবারের মতো স্টল দেওয়া হয়েছে। ফলে মেলার পরিসর বেড়েছে। এর পুরোটা ঘুরতে অনেক সময় লেগে গেল। পাঠক যারা আসবেন, তাদের এ কথা মনে রেখেই আসতে হবে। পছন্দের স্টল খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে। তবে অন্য বছরগুলোর মতো বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র আছে। সেখান থেকে স্টলগুলোর অবস্থান জেনে নেওয়া যাবে। টিএসসির উল্টো দিকের তথ্যকেন্দ্রটি অবশ্য চালু হয়নি। নতুন বই প্রাপ্তির যে ঘোষণা মাইকে দেওয়া হতো, সেই ঘোষণাও শুরু হয়নি। হয়তো আজ থেকে এসব চালু হবে। তবে প্রথম দিনেই পাঠক ও দর্শনার্থীদের পদচারণে বইমেলা প্রাণবন্ত ও মুখর হয়ে ওঠে।
বাংলা একাডেমি তথ্যকেন্দ্রের পাশেই লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। এই চত্বরের কোনো স্টলে কেউ আসেননি। এবার এই এলাকার ভেতরটা বেশ সুবিন্যস্ত আর সুসজ্জিত দেখলাম। চত্বরটির মাঝে চার-পাঁচটি আদি বৃক্ষ, নিচে কয়েকটি টবে ফুলগাছ। স্টলগুলোর চারপাশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে বিয়েবাড়িতে ব্যবহৃত লাল-নীল কাপড় দিয়ে। ‘এভাবে না করে খোলামেলা থাকলেই ভালো হতো’, বললেন সেখানে দেখা পাওয়া ‘লিরিক’ পত্রিকার সম্পাদক এজাজ ইউসুফী।
বইমেলা থেকে যখন ফিরছি তখন সব ছাপিয়ে নজর কাড়ল মেট্রোর প্রতিটি স্তম্ভের গায়ে সাঁটা পোস্টারগুলো। এগুলোর বেশির ভাগই বাহান্নর ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক পোস্টার। ছবি ব্যবহার করা হয়েছে জুলাই গণ-আন্দোলনের। প্রতিটি পোস্টারের ওপরে লেখা: ‘অমর একুশে ২০২৫/৫২-এর চেতনা/২৪-এর প্রেরণা।’ নিচে লেখা: ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়’।
গতকাল মেলায় এসেছে নতুন অনেক বই। এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্য প্রকাশনীর নতুন ৫টি বই। এগুলো হলো-
প্রিয় ১৫ গল্প/হাসনাত আবদুল হাই/ মূল্য: ৩২০ টাকা।
জুলাইয়ের অশেষ পাখিরা/মঈন শেখ মূল্য: ৩০০ টাকা।
আপনজনের স্মৃতিতে জহির রায়হান/সাক্ষাৎকার গ্রহণ: আফরোজা পারভীন/মূল্য: ২২০ টাকা।
সামান্য একটু ডিটেইলস/মূল: আদানিয়া শিবলি/অনুবাদ: ওয়াহিদ কায়সার ও ফায়েকুজ্জামান ফাহাদ/মূল্য: ২৩০ টাকা।
হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস/মূল: আব্বাস কিয়ারোস্তামি/অনুবাদ: মুমিত আল রশিদ/মূল্য: ১৬০ টাকা।