তোমার প্রশ্ন শুনে মোস্তফা কামালের একটি উপন্যাসের শিরোনাম মনে পড়ল–‘বিষাদ বসুধা’। ওই শিরোনামের মতোই আমার কাছে এবারের বইমেলা। যে একুশ মানে বাঙালির নিজেকে চিনে নেওয়া, আত্মপরিচয়ে প্রথম জেগে ওঠা–একুশের সেই চেতনার সঙ্গে জড়িত বইমেলা। আমাদের সাহিত্যে তো একটি নতুন ধারাই সৃষ্টি করেছে একুশ। সেই একুশের বইমেলা গত ৪৫ বছরে যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে সেটি যথার্থ মর্যাদায় শুরু করতে না পারা দুঃখজনক। ১ তারিখেই শুরু করা যেত। নির্বাচনের আগে-পিছে দুদিন ছুটি রাখলে হতো। ঐতিহ্য ভেঙে বিলম্বিত শুরু, রোজার মধ্যে বইমেলা জমেও উঠছে না। মেলায় পাঠক, দর্শনার্থীর উপস্থিতি অনেক কম। বইমেলার সেই উৎসব আজ নেই। প্রকাশকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সব মিলিয়ে এবারের বইমেলা বিষাদের মতো। এমনিতেই আমাদের পাঠক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির দোষ নয়, দোষ আমাদের। অ্যান্ড্রয়েড ফোনে পড়ার মতো বহু লেখা আছে। এর মাধ্যমে শিশুদেরও ভালো কিছু শেখানো, পড়ানো যায়। অভিভাবকদের এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা নিতে হবে। বাচ্চাদের দোষ আমি দেব না। আমরা তাদেরকে সৃজনশীল করে গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করছি না।
সাহিত্য কেবল মুদ্রিত অক্ষর নয়, এটি সৃজন আর মননের চর্চা, অনুভবের বিস্তার। লেখা নিয়ে আড্ডা, তর্ক, সমালোচনা এসবের ভেতর দিয়েই সাহিত্য ব্যাপ্তি পায়, শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কলম ধরা কোনো পেশাগত দায় নয়, এটি একধরনের ঐশ্বরিক প্রেরণা, অন্তর থেকে উঠে আসা সুর। যে লেখায় কেবল বাণিজ্যের হিসাব থাকে, সেখানে পাঠকের হৃদয়ের জন্য জায়গা কমে যায়। সৃজনশীল লেখা কোনো আর্থিক কাজ নয়, মনের খোরাক। তাই একজন লেখক যদি তার লেখায় পাঠকের কথা চিন্তা না করেন, বাণিজ্যিক চিন্তাই করেন, তবে সেই লেখা পাঠকের মন ছুঁতে পারে না। প্রকৃত লেখক পাঠকের কথা চিন্তা করে লেখেন কিংবা তার মনের খোরাকের জন্যও লেখেন। প্রাজ্ঞ পাঠকের হৃদয় ছুঁতে পারাই লেখকের সার্থকতা।
তরুণদের মধ্যে অনেকেই লেখেন। প্রতিবছর বইমেলায় অনেক বই প্রকাশিত হয়। তবে সেসব লেখা পাঠকের মন ছুঁতে পারে কম। অনেকেই ফেসবুকে অগোছালো আবেগে দু-চার লাইন লিখে ভাবছেন কবিতা হয়ে গেছে। একসময় হয়তো নিজের টাকা খরচ করে বইমেলায় বইও প্রকাশ করছেন। কিন্তু অনেকের মধ্যেই পঠনপাঠনের অভাব রয়েছে, সেই সঙ্গে যোগ্য অগ্রজদের সান্নিধ্য পাওয়ার যে ব্যাপারটা ঋদ্ধ হওয়া যায়, সেই বিষয়টা আজকাল উঠে যাচ্ছে। অনেকেই ছন্দ, প্রতীক, চিত্রকল্প এসব না জেনেই কবিতা লিখছেন। গদ্য কবিতা লিখলেও এসব জেনেই তা লিখতে হবে। না হলে সে লেখা স্থায়ী হবে না। একটি ভালো কবিতা একটি প্রতীকী গল্প, একটি ধাঁধার মতো। তার বহুমাত্রিক অর্থ হবে কিন্তু দুর্বোধ্য নয়। সেই কবিই সফল যে তার সময়কে ধারণ করতে পারেন এবং ভবিষ্যৎকে দেখতে পান। কবি একজন শিল্পী এবং দার্শনিক। লেখকদের পাশাপাশি পাঠকদের জন্য বলব, পড়ুন। নিজেকে আলোকিত করার জন্য পড়তে হবে। পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
নাসির আহমেদ: কবি। অনুলিখন: মুসতাক মুকুল।