গত বছর কোটা সংস্কার দাবির আন্দোলনের একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। দাবির মুখে শিক্ষার্থী ও হল প্রশাসনের সমঝোতায় লিখিত আকারে হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। ওই লিখিত সিদ্ধান্তের আলোকেই হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে এবং সেটি কার্যকরে রোডম্যাপ তৈরি করা হবে।
শনিবার (৯ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান।
ঢাবি উপাচার্য বলেন, ‘আমরা সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলগুলোকে শিক্ষাবান্ধব ও রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে আনা।’
এর আগে গত শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর পরই প্রতিবাদে রাতে বিক্ষোভে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা। সেই বিক্ষোভ চলে রাত সোয়া ৩টা পর্যন্ত। সেদিন রাত পৌনে ২টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থানরত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে বাসভবন থেকে বেরিয়ে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন।
দাবিগুলো হলো কমিটি বাতিল করার আগে কমিটির সব সদস্যের সিট বাতিল করতে হবে এবং অফিশিয়ালি ছাত্রদলের হাইকমান্ডকে ক্ষমা চাইতে হবে; হলের রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সব গুপ্ত এবং প্রকাশিত কমিটি সামনে এনে বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে; হল প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতা স্বীকার করে প্রশাসনকে ক্ষমা চাইতে হবে; ডাকসু বানচাল করার সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে; যথাসময়ে ডাকসু নির্বাচন কার্যকর করতে হবে; ২০২৪-এর ১৭ জুলাই হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের যে নীতিমালা করা হয়, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
দাবি উত্থাপনের পরপরই উপাচার্য বক্তব্য দিতে শুরু করেন। ৩-৪ মিনিট যেতে না যেতে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের বাগবিতণ্ডা। যার ফলে দীর্ঘ সময় অসমাপ্ত থেকে যায় উপাচার্যের বক্তব্য। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়। একপর্যায়ে উপাচার্য বলেন, ‘হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি মীমাংসিত। এ ব্যাপারে প্রশাসনের যে সিদ্ধান্ত, হল প্রশাসন যদি সেটি ঠিক মনে করে সেভাবে হবে।’
ফের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি চলবে না, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা চান। পরে রাত পৌনে ৩টার দিকে উপাচার্যের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘হল পর্যায়ে সব ধরনের প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি গত বছরের ১৭ জুলাইয়ের ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী নিষিদ্ধ থাকবে।’ তার এমন ঘোষণার পর রাত ৩টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যান।
ছাত্রদল-শিবির-ছাত্র অধিকার পরিষদের উপহার বর্জন
ছাত্ররাজনীতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রদল, শিবির ও ছাত্র অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া পানির ফিল্টার, ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বর্জন করেছেন মাস্টারদা সূর্য সেন হল ও রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা। সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থীরা শিবিরের দেওয়া পানির ফিল্টার ভেঙে বাইরে ফেলে রাখেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাবি করা হয়, ‘এখন যেভাবে উপহার এসেছে, একইভাবে অস্ত্রও আসবে। আমরা হলে কোনো ছাত্ররাজনীতির আধিপত্য চাই না।’
ছাত্ররাজনীতি বন্ধে এ এফ রহমান হলে প্রজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে স্থায়ীভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে হলটির প্রশাসন। এতে বলা হয়, ‘গত বছরের ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হল প্রশাসনের জরুরি সভা হয়। সভায় সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপন এখনো বহাল আছে। যেখানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়নের নাম উল্লেখ ছিল। সেই প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদসহ অন্য সব বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের নাম যুক্ত করা হলো।’
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ
হলে ছাত্ররাজনীতি চান না, শিক্ষার্থীদের এমন দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আজিজুল হক।