নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মরণে তার জন্মস্থান রংপুরের পায়রাবন্দে নির্মিত ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের’ কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হয়নি তেমন কোনো উন্নয়ন। আজ ৯ ডিসেম্বর এই মহীয়সী নারীর ১৪৫তম জন্ম ও ৯৩তম মৃত্যু দিবস। দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা, রংপুর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোদ্দ মুরাদপুর গ্রামে ১৮৮০ সালে ৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ১৯৩২ সালে ৯ ডিসেম্বর কলাকাতায় মারা গেলে তার লাশ সোদপুরে দাফন করা হয়। বেগম রোকেয়ার পৈতৃক ভিটায় ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির ওপর রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি অবস্থিত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। এর জন্য বাজেট ধরা হয় ৫ কোটি টাকা। এই কেন্দ্র স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলা একাডেমিকে। ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। গড়ে ওঠে অবকাঠামো। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটির কার্যক্রমে পূর্ণতা আসেনি দুই যুগেও। অন্যদিকে রোকেয়ার লেখা প্রবন্ধ ‘নার্সনেলী’তে উল্লিখিত বেদখল ৩৫০ বিঘা লাখেরাজ সম্পত্তি উদ্ধার হয়নি।
দিবসটি উপলক্ষে সরেজমিনে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে দেখা যায় দুরবস্থার নানা চিত্র। স্মৃতিকেন্দ্রের পাঠাগারে পাঠক এলেও রয়েছে বসার জায়গার সংকট। নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সেলাই মেশিনগুলো সারা বছর থাকে বাক্সবন্দি। দিবস উপলক্ষে চলছে ধোয়ামোছা।
২০০১ সালে চালুর পর ২ মাস ১৭ দিনের মাথায় আবারও বন্ধ হয় এটির কার্যক্রম। এরপর ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে এখানকার কর্মচারীদের বেতন-ভাতা চালু হয়।
পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জেমি আক্তারসহ সহপাঠীরা এসেছে পরিদর্শন করতে। জেমি বলে, ‘এখানে পাঠক আসেন। কিন্তু সব বই পড়তে পারেন না। সব সময় ধুলাবালিতে পূর্ণ থাকে। সেলাই মেশিনগুলো থাকে বাক্সবন্দি। দিবস এলেই ধোয়ামোছা শুরু হয়। এটি আমাদের জন্য বেদনাদায়ক।’
ঢাকা থেকে আসা সিরাজুম মনিরা বলেন, ‘এখানে এসে দেখে মনে হলো একেবারেই পরিত্যক্ত দশা। ঢাকা থেকে এসেছি। আগে মনে হয়েছিল অনেক কিছুই আছে। অন্য স্মৃতিকেন্দ্রগুলো যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সে তুলনায় এই স্মৃতিকেন্দ্র দেখে হতাশ হয়েছি।’
১৭ বছর ধরে পায়রাবন্দ রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারে স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছেন বিউটি আক্তার। তিনি বলেন, লাইব্রেরি যেভাবে হওয়া দরকার সেটা হয়নি। কোনো সরকারি অনুদান নাই। মানুষের সহযোগিতায় চলে। এভাবে আর কতদিন। ডিসেম্বর মাস এলে এত সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। মেলা এলে রোকেয়াকে নিয়ে কথা হয়, অন্য সময় সবাই চুপচাপ। যে ঘরে রোকেয়ার জন্ম, সেই ঘরের কোনো উন্নতি নাই। তার বাবার যত জমিজমা আছে, সেগুলো মানুষের দখলে। এই দখলবাজদের উচ্ছেদ করে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে কাজ করতে পারলে তার স্মৃতি ধরে রাখা সম্ভব। রোকেয়া দিবস এলেই সবাই সচেতন হন। স্মৃতিকেন্দ্র যেভাবে হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি।
আতঙ্ক প্রকাশ করে তিনি বলেন, যেভাবে ভূমিকম্প হচ্ছে, আরেকটু বেশি মাত্রার হলে যেসব স্মৃতি আছে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, এই পায়রাবন্দের ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাসপাতাল আছে, মা শিশু কল্যাণ কেন্দ্র আছে। সরকারি কলেজ আছে, শিক্ষক নাই। সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। অনেকে ফিলোসফিকালি রোকেয়াকে মানেও না। যদি মানত তাহলে চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে রোকেয়ার স্মৃতিতে গ্রাফিতি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া, রোকেয়া সম্পর্কে কটূক্তি করার মনোভাব থাকত না।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আবিদ করিম মুন্নার কাছে রোকেয়া দিবস এলেই সেলাই প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) থেকেই প্রশিক্ষণ শুরু হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সারা বছর ধরেই হয়। বেগম রোকেয়ার মরদেহ ভারত থেকে নিয়ে আসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের বলার কিছু নেই। এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। নিয়ে আসতে পারলে অবশ্যই ভালো হবে। রোকেয়ার যে বেদি, যেখানে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হবে, সেখানেই দেহাবশেষ রাখার প্রস্তাব করা আছে।’
ফাইলবন্দি দেহাবশেষ আনার প্রস্তাব
বিগত সময়ে অর্থাৎ ২০০৬ সালের ২৪ জুন পাকিস্তান থেকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মরদেহ আনার পর রোকেয়ার মরদেহ আনার দাবি তোলেন এলাকাবাসী। ওই দাবির সঙ্গে ২০০৯ সালে রোকেয়া মেলায় রংপুরের তৎকালীন ডিসি বি এম এনামুল হক একাত্মতা প্রকাশ করে ওয়াদা করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রোকেয়া সংসদ, রোকেয়া পাঠাগার ও অন্যান্য সংগঠন জোরালো দাবি তুললেও কাজ হয়নি। ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তার মরদেহ আনার ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।