বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানবসভ্যতাকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনলাইন ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে অলস, সৃজনশীলতাহীন ও বিবেকহীন করে তুলছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম এই ‘ডিজিটাল ভাইরাসে’ আক্রান্ত হয়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতায় ভুগছে। এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোছা. ইসমা খাতুন
নিশ্চিত হোক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার
মো. আব্দুল্লাহ আল মুনাইম
শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আশীর্বাদের চেয়ে বর্তমানে আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল ছেড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা এক ভয়ংকর ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই ডিজিটাল গোলকধাঁধায় পড়ে তরুণ প্রজন্ম অনিদ্রা, খিটখিটে মেজাজ ও সৃজনশীলতাহীনতায় ভুগছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই ‘মহামারি’ থেকে বাঁচতে পারিবারিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক পথ না দেখালে আগামী প্রজন্ম এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
স্মার্টফোনের নীল আলোয় বন্দি শৈশব
আহমেদ রনি
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
শিশুদের প্রাণবন্ত শৈশব আজ স্মার্টফোনের নীল আলোয় বন্দি। অভিভাবকদের ব্যস্ততা এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা শিশুদের বাস্তব জগতের পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ডিজিটাল আসক্তি কেবল শারীরিক সক্রিয়তাই কমাচ্ছে না, বরং দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, একাকিত্ব ও সৃজনশীলতাহীনতার মতো গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করছে।
যেহেতু আজকের শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ, তাই তাদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে এখনই সচেতন হতে হবে। সচেতন অভিভাবকত্বই পারে শিশুদের এই ডিজিটাল বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক শৈশব উপহার দিতে।
অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম
মোছা. আহসানা হাবিবা অরনা
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ
প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার ও আসক্তি বর্তমান কিশোর প্রজন্মকে বাস্তবমুখী শিক্ষা থেকে বিমুখ করছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাদ দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে পড়ে তারা সিদ্ধান্তহীনতা ও শারীরিক-মানসিক জটিলতায় ভুগছে। এই সংকট উত্তরণে অনলাইননির্ভরতা কমিয়ে ‘অফলাইন’ ও হাতে-কলমে শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নিয়ন্ত্রিত কম্পিউটার ল্যাবের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থ ও দক্ষ প্রজন্ম গড়তে প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বদলে সৃজনশীল ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
ভার্চুয়াল নয়, বাস্তব জ্ঞানচর্চা জরুরি
হাফসা পারভীন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ডিজিটাল প্রযুক্তি আশীর্বাদ হলেও এর অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ফেসবুক, টিকটক ও অনলাইন গেমের গোলকধাঁধায় পড়ে তরুণরা পাঠ্যবই এবং জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ভার্চুয়াল জগতের মোহে সময়ের অপচয় ছাড়াও বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা। সুস্থ ও জীবনমুখী প্রজন্ম গড়তে এই ‘অসুস্থ জগৎ’ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা জরুরি।
এ জন্য অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সময় দান, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা এবং সর্বস্তরে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আসক্তি সম্পর্কে সচেতন হোন
সাদিয়াতুননাহার বন্যা
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত আসক্তি আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মাঝে দূরত্বের দেয়াল তৈরি করছে। বর্তমান প্রজন্ম মাঠের খেলার বদলে ভার্চুয়াল গেমে মত্ত হওয়ায় তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লাইক-কমেন্টের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের প্রবণতা মানুষের অকৃত্রিম অনুভূতি ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছে। এমনকি ভিউ বাড়ানোর নেশায় নৈতিক মূল্যবোধহীন কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
শিক্ষার্থীদের একাগ্রতা নষ্ট করছে মোবাইলের নোটিফিকেশন। এই আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।