শারীরিক গঠনের পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজের চাপ ও মানসিক উদ্বেগের কারণে নারীর ঘুমের চাহিদা পুরুষের তুলনায় বেশি। এমনটাই বলা হচ্ছে ‘স্লিপ ডিসঅর্ডার ইন উইমেন, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন’-এর একটি রিপোর্টে।
আজকের দ্রুতগামী জীবনে ঘুমের ঘাটতি একটি সাধারণ সমস্যা। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, অফিসের কাজ, সংসারের দায়িত্ব আর নানা সামাজিক চাপ সামলে রাতে যথেষ্ট বিশ্রাম নিতে পারেন না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘাটতি নারীদের জন্য পুরুষের তুলনায় বেশি ক্ষতিকর। এর পেছনে রয়েছে শারীরিক গঠন, হরমোনের প্রভাব, মানসিক চাপ এবং জীবনযাত্রার ধরন।
জৈবিক গঠন ও হরমোনের ওঠানামা
নারীর শরীরে হরমোনের ওঠানামা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। মাসিক, গর্ভাবস্থা কিংবা মেনোপজ প্রতিটি ধাপে হরমোন পরিবর্তনের কারণে ঘুমের মান প্রভাবিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা সাধারণত হালকা ঘুমে থাকেন। সামান্য শব্দ, আলো বা মানসিক অস্থিরতায় তাদের ঘুম ভেঙে যায়। তাই শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে তাদের তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম প্রয়োজন।
দায়িত্বের দ্বিগুণ চাপ
আজকের কর্মজীবী নারী ঘরে ও বাইরে সমানভাবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মক্ষেত্রের চাপের পাশাপাশি সংসারের কাজ, সন্তান লালনপালন ও সামাজিক দায়িত্ব মিলিয়ে তাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততা অনেক বেশি। এ ব্যস্ততা শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ায়। ফলে শরীর ও মস্তিষ্ক উভয়েরই পুনর্গঠনের জন্য তাদের ঘুমের প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
ঘুমের অভাব ও তার প্রভাব
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৪০ শতাংশ নারী অনিদ্রায় ভোগেন। ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ কমে যায়, বিরক্তিভাব বাড়ে এবং কাজের মানও নষ্ট হয়। শুধু তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে কম ঘুম হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে। নতুন তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। ঘুম কম হলে এসব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
ভালো ঘুমের জন্য করণীয়
ডিজিটাল ডিভাইস এড়িয়ে চলুন: ঘুমানোর আগে মোবাইল, টিভি বা ল্যাপটপ ব্যবহার কমাতে হবে। কারণ স্ক্রিনের নীল আলো মস্তিষ্ককে জাগ্রত রাখে।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন: রাতে ভারী বা ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলে হজমে সমস্যা হয়, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়। আবার ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় (কফি, চকলেট, চা) ঘুমের মান নষ্ট করে।
শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন: শোবার ঘর অন্ধকার, নিরিবিলি এবং আরামদায়ক রাখা দরকার। চাইলে হালকা সুরেলা সংগীত শুনতে পারেন, তবে হেডফোন ব্যবহার না করাই ভালো।
নিয়মিত রুটিন মানুন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং জাগা শরীরের জৈবিক ঘড়িকে সঠিক রাখে।
সুতরাং নারীর জন্য ঘুম কেবল বিশ্রাম নয়; বরং এটি এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক শক্তি। মানসিক শান্তি, হরমোনের ভারসাম্য, শারীরিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ঘুম শুধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই বাড়ায় না, ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনকেও সমৃদ্ধ করে।
তাই প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। ঘুম যত গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন হবে, নারী তত বেশি শক্তি, উদ্যম ও মানসিক স্থিরতা নিয়ে নতুন দিন শুরু করতে পারবেন।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন
/এসএল
.jpg)