চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী অনেক কারণের মধ্যে খালের মধ্যে তৈরি হওয়া ‘বোটল নেক’ অন্যতম। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিটি খালকে সংকুচিত করে খালের বিভিন্ন অংশে স্থাপনা করা হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন খালের বিভিন্ন পয়েন্ট বোটল নেকের মতো সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির ‘দখল দূষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর খাল: জলাবদ্ধতায় প্রভাব’ গবেষণায় এ তথ্যটি ওঠে এসেছে।
গবেষকদলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হলেও তার সুফল মিলছে না। চসিক এবং সিডিএ খালের সংস্কার, খাল পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ ও নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের এবং পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিলেও কাজের গতি খুব ধীর। দখলমুক্ত করতে মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও তা টেকসই হয়নি। বর্ষা এলেই নগরবাসীর জন্য যেন অভিশাপ নেমে আসে। সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে তারা কাজ করেছেন। তারা নগরের ১১টি খালের কেইস স্টাডি করেছেন। সেখানে অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে ‘বোটল নেক’ সমস্যাকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব সমস্যার কারণ এবং সমাধানে করণীয়ও বলে দিয়েছেন।'
প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের প্রধান খাল চাক্তাই খালের বিভিন্ন অংশ দখল ও ভরাটের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বহদ্দারহাট মোড় এলাকায় খালের প্রস্থ ১৬ দশমিক ৫ ফুট এবং ৯ দশমিক ৫ ফুট। বাড়ইপাড়ায় তা ৪৪ দশমিক ৫ ফুট। বাদুরতলা এলাকা তিনটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে খাল দখল করে। আমিন হাজী রোডসংলগ্ন অংশে দেখা যায়, প্রশস্ততা আরও কমে ২৮ দশমিক ৭ ফুট হয়ে গেছে। চাক্তাই খালের শাখা খালগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ।
দেবপাহাড় থেকে চট্টগ্রাম কলেজের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রাম কলেজের পশ্চিম গেট বরাবর শাখা খাল চাক্তাই খালের মুখের প্রশস্ততা মাত্র ৭ দশমিক ৬ ফুট। খালের গভীরতা হ্রাসের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় খালের মধ্যে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য।
এদিকে বহদ্দারহাট এলাকায় (মির্জা খালের সংযোগ) স্থলের প্রশস্ততা মাত্র ৯ দশমিক ৬ ফুট, আরেক জায়গায় ১৬ ফুট, যার অর্ধেকের বেশি অংশ প্লাস্টিক আর ময়লা জমে ভরাট হয়ে আছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চট্টগ্রামের দুঃখ’ চাক্তাই খালের নাব্য হ্রাস পাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষাকালে অল্প বৃষ্টিতেই খালের আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। এ কারণে যানজট ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে, অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে মহেশ খালের কেইস স্টাডিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম নগরীর বৃহৎ একটি এলাকার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম এই খাল, যা নগরীর ডিটি রোড থেকে শুরু হয়ে প্রায় ১৪ কিলোমিটার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সল্টগোলা ক্রসিং হয়ে বন্দর কনটেইনার টার্মিনালের পাশ দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে মিশেছে। নগরের বন্দর, ডবলমুরিং ও হালিশহর, গোসাইলডাঙ্গা, উত্তর-মধ্যম, দক্ষিণ ও মধ্যম হালিশহর, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, সিঅ্যান্ডবি কলোনি, বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি, মা ও শিশু হাসপাতাল এলাকা, বহুতল কলোনি প্রভৃতি এলাকা এই খালের প্রবাহপথে অন্তর্ভুক্ত।
চুয়েটের, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের অসচেতনতা, অবহেলার ফসল হিসেবে বোটল নেকগুলো তৈরি হয়েছে। বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রকল্পের কাজ চলছে তার মাধ্যমে কিছু বাধা অপসারিত হচ্ছে। এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। সব বোটল নেক চিহ্নিত করে অপসারণ করতে হবে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভূমি মালিকরা সিডিএ থেকে অনুমোদন নিয়েই ভবন নির্মাণ করেন। সিডিএর মনিটরিং ব্যবস্থাকে জোরালো করতে হবে। অথচ অতীতে দেখা গেছে সরকারি সংস্থাও খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করেছে। সেই কারণে সাধারণ ভূমি মালিকরাও সাহস করেছেন। খালের বোটল নেক দূর করার জন্য প্রথমে সিটি করপোরেশনের স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছি।’