চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ পাহাড় কাটা ও খাল-নালা দখল-ভরাট। এ দুটি বিষয়ে অনেকবার সতর্কতা, মামলা ও অভিযানের পরও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
২০২২ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, নগরীর জনসংখ্যা ৩২ লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার আকর্ষণে শহরে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। তবে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, খাল-নালা ভরাট ও দখল বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো মূলত বালির পাহাড়। পাহাড়ের কোনো স্থান কাটা হলে সেই জায়গা থেকে কয়েকগুণ বালি বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে খাল-নালায় জমে। এতে দ্রুত পলি জমে জলাধারগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি বর্ষাকাল এলেই মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত ও অবৈধ বসতি সরানোর মতো সাধারণ পদক্ষেপ নেয়। পাহাড় কাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করলেও চসিক, সিডিএ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
হিলভিউ আবাসিকে পাহাড় কেটে বাড়ি বানানোই সম্প্রতি একজনকে মাত্র ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। খুলশী এলাকায় গরুর খামার, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করছে একাধিক চক্র। ডেভেলপার কোম্পানি সানমার পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ করলেও জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় দৃশ্যমানভাবে পাহাড় কেটে দখল করা হচ্ছে। সেখানে বসতি, দোকান, মন্দির, গির্জা গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অসহায় পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার নামে দখল হচ্ছে পাহাড়। জামাল খান, পাহাড়তলী, আকবরশাহ, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় জানা গেছে, চট্টগ্রামে গত চার দশকে ২০০ পাহাড়ের মধ্যে ১২০টি বিলুপ্ত হয়েছে, যা মোট পাহাড়ের ৬০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান বলেন, ‘পাহাড় হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার খুঁটি। এগুলো ধ্বংস হলে নগরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উষ্ণতার মুখে পড়বে।’
নগরবিদ ও স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, ‘চট্টগ্রামের পাহাড় বালির তৈরি হওয়ায় সহজেই ধসে পড়ে। যেকোনো মূল্যে পাহাড় রক্ষা করতে না পারলে জলাবদ্ধতা নিরসন অসম্ভব।’ পরিবেশকর্মী রীতু পারভীন বলেন, ‘পাহাড় কাটায় গাছপালা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। খাল-নালায় পলি জমে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।’
এদিকে নগরের বেশির ভাগ খাল-নালাই এখন গার্বেজ স্টেশনে পরিণত। নগরবাসীই অসচেতনভাবে ফেলে দিচ্ছেন ময়লা, ইলেকট্রনিকস বর্জ্য, পুরোনো কাপড়চোপড়। এতে খাল-নালার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘পরিবেশ আইনের কার্যকারিতা নেই। চার্জশিট হয় না, রায় হয় না, ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করতে পারেন না। ১ লাখ টাকা জরিমানা করে দায় সারে পরিবেশ অধিদপ্তর।’
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, পাহাড় রক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছেন, তবে জনবলসংকটের কারণে অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।