লাশবাহী গাড়ির দরজাগুলো খোলার সঙ্গে সঙ্গেই স্তব্ধ হয়ে গেল সাতক্ষীরার দুটি গ্রাম। চিরচেনা উঠানে যখন দুটি কফিন নামানো হলো, তখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে শুরু হলো স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে সাতক্ষীরা থেকে হাজার মাইল দূরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু গত ১১ মে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সেই দুই রেমিট্যান্সযোদ্ধা–শফিকুল ও নাহিদুলের নিথর দেহ অবশেষে কফিনবন্দি হয়ে ফিরল তাদের প্রিয় জন্মভিটায়।
গত শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কফিন দুটি এসে পৌঁছায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল রবিবার সকালে মরদেহ দুটি সাতক্ষীরায় আনা হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ধারদেনা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে চাওয়া দুই তরুণের কফিন ছুঁয়ে স্বজনদের এই অন্তহীন মাতম উপস্থিত যে কাউকেই স্থির করে দেয়।
সাতক্ষীরা সদরের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম একসময়ে থাকতেন সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও অভাব পিছু ছাড়েনি। ধারদেনা শোধের অদম্য ইচ্ছা আর সন্তানদের একটু ভালো রাখার আশায় মাত্র কয়েক মাস আগে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। লেবাননে গিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে প্রথম উপার্জনের টাকা পাঠিয়ে স্ত্রী রুমা খাতুন আর দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনছিলেন। কিন্তু স্বামীর সেই নিথর কফিন আগলে রেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন রুমা। আর দুই অবুঝ শিশুকন্যা স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বাবার কফিনের দিকে, যেন তারা বুঝতেই পারছে না তাদের মাথার ওপর থেকে ছায়া চিরতরে সরে গেছে।
শফিকুলের বোন জাহানারা খাতুন ভাইয়ের কফিন ধরে বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার ভাইটা তো কোনো পাপ করেনি। শুধু আমাদের মুখে একটু ডাল-ভাত তুলে দেওয়ার জন্য, ধারদেনার বোঝা থেকে মুক্তি পেতে সে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। প্রথম মাসের টাকা পাঠিয়ে বলেছিল, আপা, এবার আমাদের দুঃখ ঘুচবে। সেই ভাই আজ লাশ হয়ে ফিরল! আমরা এখন কার দিকে তাকাব?’
ছেলের শোকে পাথর হয়ে গেছেন মা আজেয়া খাতুন। বিলাপ করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এক দৃষ্টিতে কফিনের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কলিজার টুকরো এভাবে কফিনে বন্ধ হয়ে ফিরবে, আমি কোনোদিন ভাবিনি। ও যাওয়ার সময় বলেছিল, মা আর কষ্ট করা লাগবে না। ওর সেই কথা কি এভাবেই সত্যি হলো? ও আল্লাহ, তুমি আমার ছেলের বদলে আমাকে কেন নিয়ে গেলে না!’
এদিকে এতিম দুই শিশুর দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, ‘পরিবারটি একেবারেই নিঃস্ব। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। এই ছোট ছোট মেয়ে দুটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিবারটির কারও কর্মসংস্থান জরুরি। নইলে এই এতিম শিশুরা পথে বসে যাবে।’
একই দিন লাশের খাটিয়া পৌঁছেছে আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের যুবক নাহিদুলের বাড়িতে। নোনা পানির এই অবহেলিত জনপদে নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন নাহিদুল। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া সন্তানকে আজ কফিনবন্দি দেখে পাগলপ্রায় বৃদ্ধ বাবা-মা।
ছেলের কফিনে মাথা কুটে কাঁদছিলেন বৃদ্ধ বাবা আব্দুল কাদের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জমিজমা যা ছিল সব বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ও আমাদের এই বুড়ো বয়সের লাঠি হবে, সংসারের অভাব দূর করবে। কিন্তু যুদ্ধ আমার সব শেষ করে দিল।’
এদিকে ছেলেকে হারিয়ে মা নুরুন্নাহার খাতুন এখন শয্যাশায়ী। ছেলের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। কফিন বাড়িতে আসার পর তাকে ধরে উঠানে আনা হলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। চেতনা ফিরতেই বিলাপ করে বলেন, ‘আমার নাহিদুল কই? ও তো আমাকে বলেছিল ভালো জায়গায় আছে, ভালো আছে। আমার সোনার টুকরো কেন কথা বলে না? তোমরা ওর কফিনটা খোলো, আমি একবার আমার বাছারে (সন্তানকে) বুকে জড়ায় (জড়িয়ে) ধরব।’
তবে এই চরম সংকটের মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দুটির পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার। খুলনা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) খালেদুর রহমান জানান, দুই নিহতের পরিবারকে সহায়তার জন্য তাৎক্ষণিক কিছু দাপ্তরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এই দুই রেমিট্যান্সযোদ্ধার পরিবার যাতে দ্রুত সব ধরনের আর্থিক সুরক্ষা ও অনুদান পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।
গতকাল রবিবার দুপুরের দিকে শফিকুল ও নাহিদুলের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়। দুই পরিবার অন্তত সন্তানের শেষ স্মৃতিটুকু ছুঁয়ে বিদায় জানানোর সুযোগ পেলেও একই দিনে পৃথক হামলায় নিহত জেলার কলারোয়া উপজেলার শুভ কুমার দাসের হতভাগ্য পরিবারের ভাগ্যে সেই সান্ত্বনাটুকুও জোটেনি। লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ড্রোন হামলার সেই ভয়াবহ আঘাতে শুভর শরীরটি এতটাই ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে যে, তার মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।