ঈদুল আজহার দিন। দেশের অনেক শহরে তখনও কোরবানির বর্জ্য অপসারণে ব্যস্ত সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। কোথাও রাস্তায় পড়ে আছে পশুর উচ্ছিষ্ট, কোথাও দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ নগরবাসী। কিন্তু সিলেট নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে তখন ভিন্ন দৃশ্য। দুপুর গড়ানোর আগেই অধিকাংশ কোরবানির বর্জ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পরিচ্ছন্ন নগরীর সেই দৃশ্য দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।
এভাবে কেবল ঈদের দিন নয়, সিলেট নগরীর প্রতিদিনকার দৃশ্য। নিরবচ্ছিন্ন এই পরিচ্ছন্নতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা এবং একদল পরিচ্ছন্নতাকর্মীর নিরলস শ্রম। আর সেই প্রচেষ্টার নেতৃত্বে আছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন।
৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’।
পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার এই বিশেষ দিনে সিলেটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের গল্প বলতে গেলে উঠে আসে একাগ্র একলিম আবদীনের নাম।
সেনাবাহিনীর গৌরবময় কর্মজীবন শেষে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার সন্তান একলিম আবদীন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে সেনাবাহিনী প্রধানের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা অবসরের পর নিজ অঞ্চলের জন্য কিছু করার প্রত্যয় নিয়েই সিলেটে ফেরেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিন একলিম দেখেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। কোথায় কত বর্জ্য উৎপন্ন হয়, কতটি ভ্যান কাজ করছে কিংবা কতটুকু বর্জ্য প্রতিদিন সংগ্রহ করা হচ্ছে- এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যও ছিল না।
খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমেই বুঝতে পারি, তথ্য ছাড়া কোনো ব্যবস্থাপনা কার্যকর হতে পারে না। তাই আমরা জরিপ করেছি, তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং পুরো ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি।’
এরপর শুরু হয় পরিবর্তনের অভিযাত্রা। ওয়ার্ডভিত্তিক সুপারভাইজার নিয়োগ, নির্দিষ্ট রুট পরিকল্পনা, নিয়মিত সমন্বয় সভা এবং তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রযুক্তিকেও যুক্ত করা হয় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে। কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুগল ক্যামেরা অ্যাপ ব্যবহার শুরু করেন তিনি। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শেষে শ্রমিক ও সুপারভাইজারদের নির্ধারিত স্থানের ছবি তুলে গ্রুপে পাঠাতে হয়। ফলে কোথায় কাজ হয়েছে, কখন হয়েছে এবং কতটুকু হয়েছে- তার একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হতে থাকে।
একলিম আবদীনের ভাষায়, ‘জবাবদিহিতা থাকলে কাজের মান বাড়ে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সবাই নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হয়েছে।’
তবে শুধু নিয়ম আর প্রযুক্তি দিয়েই পরিবর্তন আসেনি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। যেসব শ্রমিক দীর্ঘদিন শহর পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের স্বাস্থ্যসেবা, পোশাক ও কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। ভালো কাজ করা শ্রমিক ও সুপারভাইজারদের প্রকাশ্যে প্রশংসা ও পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও চালু করেছেন।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের সম্মান দিতে হবে। তারা যদি ভালোভাবে কাজ করতে পারেন, তাহলে পুরো শহরই উপকৃত হবে।’
সিলেটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের আরেকটি বড় দিক হচ্ছে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর সুফলও মিলছে। আগে যেখানে ছড়া ও ড্রেন পরিষ্কারের সময় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পাওয়া যেত, এখন সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
একলিম আবদীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই কৃতিত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের নয়। নগরবাসীও অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন। তারা এখন আগের তুলনায় কম বর্জ্য ফেলছেন এবং নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ময়লা দিচ্ছেন।’
বর্তমানে সিসিক প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন করছে। কয়েক বছর আগেও এ পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪৫ টন। বর্জ্য সংগ্রহ বৃদ্ধিকে তিনি জনসচেতনতা ও সেবার পরিধি বাড়ার ইতিবাচক ফল হিসেবে দেখেন। তবে কাজের পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। সমালোচনা, অপপ্রচার এবং নানা প্রতিবন্ধকতার মুখেও তাকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু তাতে দমে যাননি।
নিজের শহরের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বলতে গিয়ে একলিম বলেন, ‘আমি একজন সিলেটি। নিজের শহরের জন্য কিছু করতে পারাটা আমার কাছে সৌভাগ্যের বিষয়। ভালো কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই। কিন্তু মানুষ যখন পরিবর্তন দেখে, তখন সেই কষ্ট সার্থক মনে হয়।’
প্রকৃতি, নদী, পাহাড় ও সবুজে ঘেরা সিলেটকে একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন একলিম আবদীন। তার বিশ্বাস, প্রশাসন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিলেট একদিন দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে। সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয় পরিচ্ছন্ন সিলেট গড়ার কাজ।
/থিও