সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আলোচিত সাদা পাথর পর্যটন ঘাটটি অবশেষে ইজারায় ফিরছে। ধলাই নদীর অববাহিক এলাকার ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর নামের পর্যটন ঘাটটি এবার বিগত দিনের ইজারামূল্যের প্রায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায়।
সাধারণ ইজারা গ্রহীতাদের মধ্যে বিষয়টি ‘এক লম্ফে দুই কোটির ঘাট’ হিসেবে আলোচিত ছিল। এই অবস্থায় উপজেলা প্রশাসনের যোগাসাজশে একটি চক্র খাস কালেকশনের নামে লুটপাটে সক্রিয় ছিল।
ঘাটের ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রেখে খাস কালেকশন প্রক্রিয়াটি সাদা পাথর লুটকাণ্ডের পর আলোচনায় আসলে প্রায় দেড় বছর পর ইজারা দিতে উপজেলা প্রশাসন দরপত্র আহ্বান করে।
১৬ সেপ্টেম্বর ঘাট ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়।
সাদা পাথর লুটকাণ্ডের পর কোম্পানীগঞ্জের নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্ম রবিন মিয়া খবরের কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ই্উএনও স্বাক্ষরিত দরপত্রে বলা হয়, ১৪৩২ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য ইজারা প্রদান করা হবে। ইজারা দেওয়া হবে ভোলাগঞ্জ দশ নম্বর ঘাট থেকে সাদা পাথর পর্যটন ঘাট ও পার্কিং এলাকা। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ৫ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২৭ অক্টোবর সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়া হবে।
প্রকাশিত দরপত্রে ঘাটের কাঙ্খিত সরকারি ইজারামূল্য ধরা হয় এক কোাটি ৯০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৩ টাকা। ঘাটটির বিগত তিন বছরের গড়মূল্য উল্লেখ করা হয় এক কোটি ৭৩ লাখ ৮ হাজার ৫২১ টাকা। এরমধ্যে ১৪২৯ বাংলা সনে ইজারা মূল্য ছিল এক কোটি ১২ লাখ টাকা, ১৪৩০ বাংলায় এক কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ১৪৩১ বাংলা সনে এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে ইজারামূল্য দাঁড়ায় দুই কোটি ৮৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬২ টাকা।
‘এক লম্ফে দুই কোটির ঘাট’ হিসেবে সাধারণ ইজারা গ্রহীতাদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। কিন্তু এ চাঞ্চল্যের কোনো অনুসন্ধান করা হয়নি।
উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১২ মার্চ সাদাপাথর নৌকা ঘাট ও গাড়ি পার্কিং এরিয়ার ইজারা স্থগিত করে খাস কালেকশন শুরু হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ১৪৩১ বাংলা সনের জন্য ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাট থেকে সাদা পাথর পর্যটন ঘাট ও ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর গাড়ি পার্কিং এলাকা ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন উচ্চ আদালতের একটি রিটে ২৫ ফেব্রুয়ারি ইজারা বিজ্ঞপ্তির কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেয়। ৩ মার্চ ১৪৩০ বাংলা সনের ইজারামূল্যের অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ বর্ধিত হারে আগের ইজারাগ্রহীতা কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমানেকে পুনরায় ১৪৩১ বাংলা সনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। ১১ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের লিভ টু আপিলের আদেশ পাওয়ার প্রেক্ষিতে লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ইজারার পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এর পর থেকে উপজেলা প্রশাসন খাস কালেকশনের মাধ্যমে টাকা আদায় শুরু করে।
১৪৩০ বাংলা সনের ইজারাদার সূত্রে জানা যায়, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন পার্কিং ও নৌকা ঘাটে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা কালেকশন হতো। তাছাড়া ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা কালেকশন হয়েছে। কিন্তু খাস কালেকশনের স্টেটমেন্ট ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ লাখের বেশি টাকা কখনো জমা দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সাদাপাথর পর্যটনের নৌকা ঘাট ও গাড়ি পার্কিংয়ের খাস কালেকশন থেকে দুই ইউএনও হাতিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। এরমধ্যে গত রোজা ঈদের ৬ দিনে পাথর লুটকাণ্ডে বদলি হওয়া ইউএনও আজিজুননাহার ১৮ লাখ টাকা নিয়েছেন। খাস কালেকশন আদায় প্রক্রিয়ায় থাকা উপজেলা ভূমি অফিস, উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের লুটপাটে যোগসাজশ রয়েছে।
সাধারণত সরকারি ছুটি বা ঈদের ছুটিতে পর্যটকের বিপুল সমাগম ঘটে সাদাপাথর এলাকায়। পর্যটনকেন্দ্রে সরাসরি গাড়ি দিয়ে যাতায়াত করা যায় না। সেখানে ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর থেকে নৌকা দিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি নৌকা রিজার্ভ পদ্ধতিতে ৮০০ টাকা করে ভাড়া নিতে হয়। এই ৮০০ টাকার ৪৫০ টাকাই যায় খাস কালেকশনে। আর মেশিনের তেল ও খরচ বাবদ বাকি ৩৫০ টাকা দেওয়া হয় নৌকার মাঝিকে। ঈদের ছুটি, সরকারি ছুটি ও শুক্র-শনিবার এসব নৌকায় ৫ থেকে ৮টি ট্রিপ দিয়ে থাকে। তবে পর্যটকের চাপ বেশি থাকলে ১২ থেকে ১৫ ট্রিপও দেয় একেকটি নৌকা।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের সময় ১৬০টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে পর্যটক বহন করা হয়। ঈদের লম্বা ছুটি হওয়ায় লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগম ঘটে। এ সময় একদিনে সব নৌকায় ১ হাজার ৮০০টি পর্যন্ত ট্রিপ দেয়। এ হিসেবে ৬ দিনে প্রায় ১০ হাজার ট্রিপ দিয়েছে ১৬০টি নৌকা। এতে খাস কালেকশন বাবদ প্রায় ৪৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এ ছাড়াও গাড়ি পার্কিং এরিয়া থেকে ঈদের ৬ দিনে ৫ লাখ টাকা কালেকশন হয়েছে। অস্বাভাবিক খরচ বাদ দিয়ে ইউএনওর কাছে জমা হয় ২৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
খাস কালেকশন আদায় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের মাধ্যমে একটি নথি এ প্রতিবেদনের হাতে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ৩১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। ওই দিন সব খরচ বাদ দিয়ে ইউএনওর কাছে জমা দেওয়া হয় ১ লাখ ৬০ হাজার ৩০০ টাকা। এর পর যথাক্রমে ১ এপ্রিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৯০ টাকা, ২ এপ্রিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৭০ টাকা, ৩ এপ্রিল ৭ লাখ ৪ হাজার ৩৪০ টাকা, ৪ এপ্রিল ৫ লাখ ৮ হাজার ৪৫০ টাকা এবং ৫ এপ্রিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৪৩০ টাকা জমা দেওয়া হয়।
ঈদুল ফিতরের ওই ৬ দিন দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা ভূমি সহকারী কর্মকর্তা অর্জুন লাল রায়। তার হাতের লেখা এই হিসাবটিতে এতে দেখা যায়, ৩১ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ইউএনও আজিজুননাহারের (পাথর লুটকাণ্ডে বদলি) কাছে জমা দিয়েছেন ২৯ লাখ ৭৬ হাজার ৪১০ টাকা। অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের উপজেলা পর্যটন উন্নয়ন তহবিলের ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট থেকে জানা যায়, ওই ৬ দিনে ১১ লাখ ৮০ হাজার ৪৯০ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
অমিয়/