সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘মিনিস্টার বাড়ি’। চুন-সুরকির ছাদওয়ালা ‘লেট-ব্রিটিশ’ স্থাপত্যশৈলীর এই বাড়িটি চারপাশের বহুতল ভবনের মাঝে এখনো দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বাড়িটির মালিক ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের আসামের মন্ত্রীখ্যাত রাজনীতিক আবদুল হামিদ। প্রায় ৯৫ বছর টিকে থাকা এই আসামস্মৃতির নিদর্শনটি এখন ধ্বংসের মুখে।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিদর্শনে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। অধিদপ্তর মালিকপক্ষকে আগামীকাল রবিবার (২৬ অক্টোবর) পর্যন্ত ভাঙার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গবেষণা সহকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক সরেজমিন গিয়ে এ নির্দেশ দেন।
দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ছাদসহ দরজা-জানালার অধিকাংশ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাঙার কাজের দায়িত্বে থাকা ভাঙারি ব্যবসায়ী মহরম আলী জানান, তিনি বাড়িটি ভাঙার জন্য ভাঙারির দরে ১৮ লাখ টাকায় কিনেছেন। সম্পূর্ণ ভাঙতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে।
বাড়ির মালিকপক্ষের জামাতা আনিসুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ১৯৩০ সালে নির্মিত বাড়িটির মোট আয়তন ছিল ৬৫০ শতক। বিক্রি করতে করতে বর্তমানে মাত্র ৮১ শতক জমি অবশিষ্ট আছে। চুন-সুরকির ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ জন্য পারিবারিক সিদ্ধান্তে বাড়িটি ভাঙা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মিনিস্টার পরিবারের সবাই এখন দেশের বাইরে। পরিবারের সদস্যদের অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন, কেউ কেউ কেঁদেছেনও। কিন্তু বাস্তবতার কারণে আমরা ভাঙতে বাধ্য হয়েছি।’
স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ আবদুল হামিদ। তিনি ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। সেই সূত্রেই বাড়িটি ‘মিনিস্টার বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়।
এই বাড়িতে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন তৎকালীন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব-মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেকে। আবুল মাল আবদুল মুহিত তার আত্মজীবনী গ্রন্থে এই বাড়ির উল্লেখ করেছেন। মিনিস্টার আবদুল হামিদ তার দাদা ছিলেন।
স্থপতিদের সংগঠন ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ’ (আইএবি) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক স্থপতি রাজন দাশ জানান, বাড়িটি ১৯৩০ সালে নির্মিত হলেও এর গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা যায়, এটি আরও পুরোনো। তিনি বলেন, ‘চুন-সুরকির ছাদ নির্মাণের প্রচলন উনিশ শতকের গোড়ার দিকের। বাড়িটিতে লেট-ব্রিটিশ স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। টিলার ওপর পূর্বমুখী এই বাড়িটিতে রয়েছে ৯টি সিঁড়ি ও ৭টি কক্ষ।’
তিনি আরও জানান, সুরমা নদীর ওপর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন সেতু কিনব্রিজের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন মিনিস্টার আবদুল হামিদ। এ হিসেবেও বাড়িটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং শতবর্ষী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২০ অক্টোবর বাড়ি ভাঙার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ‘ভয়েস টোয়েন্টিফোর’-এর কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবদুর রহমান হীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাইভ করলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। তিনি জানান, পরিবারের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান এবং লাইভ করেন।
লাইভ ভিডিওতে অসংখ্য মানুষ মন্তব্য করে বাড়ি ভাঙার প্রতিবাদ জানান। রাজনীতিক ও সমাজকর্মী রেজাউল করিম আলো মন্তব্য করেন, ‘শুধু ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে শতবর্ষী স্থাপনা ভেঙে ফেলা যৌক্তিক নয়। যদিও এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি, তবু এমন শৈল্পিক স্থাপনা এখন আর তৈরি করা সম্ভব নয়। এমন ঐতিহ্য ধ্বংস করা যত সহজ, সৃষ্টি করা তার চেয়ে বহু গুণ কঠিন।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রত্নতত্ত্ব আইন, ১৯৬৮’ অনুযায়ী ১০০ বছর বা তার বেশি পুরোনো এবং ঐতিহাসিক, শিল্প, স্থাপত্য, ধর্ম বা সংস্কৃতিগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো স্থাপনা প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা যায়। একবার ঘোষণা করা হলে অনুমতি ছাড়া তা ভাঙা, সংস্কার, পরিবর্তন বা বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গ করলে জেল, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত গবেষণা সহকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যাচাই-বাছাই চলছে। রবিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ততদিন পর্যন্ত মালিকপক্ষকে ভাঙার কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।’