সাতক্ষীরার শ্যামনগরে চলাচলের পথের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গোলাম হোসেন (৬০) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সকালে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের জাবাখালী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর স্থানীয় জনতার সহায়তায় চার হামলাকারীকে আটক করে শ্যামনগর থানা পুলিশ।
নিহত গোলাম হোসেন জাবাখালী গ্রামের মৃত হামিজ উদ্দিন মোড়লের ছেলে। পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন। তিনি দুই ছেলে ও এক কন্যাসহ একাধিক স্বজন রেখে গেছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তা নিয়ে গোলাম হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেশি বদর মোড়লের ছেলে রেজাউল মোড়ল ও ইমান আলী মোড়লের ছেলে সাইফুল মোড়ল, সেলিম মোড়ল ও ফারুক মোড়লসহ কয়েকজনের বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে একাধিকবার কথা-কাটাকাটি ও স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক হলেও বিরোধের স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। সর্বশেষ এ বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে নিহত গোলাম হোসেন বিচারের দারস্ত হলে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সালিশের দিন নির্ধারণ করে। তবে ঐদিন প্রতিপক্ষরা হাজির না হলে পুনরায় আগামী বৃহস্পতিবার সালিশের দেন নির্ধারণ করে স্থানীয় একটি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম।
নিহত গোলাম হোসেনের ভাতিজা জাহাঙ্গীর আলম, স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম ও আব্দুর রশিদ জানান, একই বিষয়ে নিহত গোলাম হোসেন সাতক্ষীরা কোর্টে একটি মামলাও দায়ের করেন। ওই মামলায় কোর্ট নোটিশ জারি করলে ক্ষিপ্ত হয়ে শনিবার সকাল ৮টার দিকে বিরোধপূর্ণ ওই পথের কাছে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র (ছুরি), লোহার রড ও লাঠি দিয়ে গোলাম হোসেনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শী রবিউল ইসলাম জানান, এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গোলাম হোসেনকে গুরুতর আহত করা হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শাকির হোসেন বলেন, নিহতের বুকে ও পেটে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত আছে। এ ছাড়া পিঠ, পায়ে ও কোমরের পেছনে আঘাতের চিহ্ন আছে। হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় জনতা তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীদের ধাওয়া দিয়ে একটি ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে পুলিশকে খবর দিলে কালিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজিবের নেতৃত্বের শ্যামনগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নয়জনকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পুলিশ জানায়, অবরুদ্ধ করা বাড়ি থেকে রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে।
এসময় ওই বাড়ি থেকে অভিযুক্ত এমান আলী মোড়লের ছেলে আত্মসমর্পণ করা বনদস্যু সেলিম মোড়ল (৫০), সাইফুল মোড়ল (৩৫), ফারুক মোড়ল (৩২), বদর উদ্দিন মোড়লের ছেলে রেজাউল মোড়ল (৪০), রেজাউলের স্ত্রী মাছুমা বেগম (৩৫), সেলিম মোড়লের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৪০), সাইফুল মোড়লের স্ত্রী মাহফুজা বেগম (৩০), ফারুক মোড়লের স্ত্রী জহুরা খাতুন (৩০) ও এমান আলীর স্ত্রী সফুরা বেগম (৬৫) কে আটক করা হয়।
অভিযুক্তদের আটকের পর উত্তেজিত জনতা ঘরবাড়ি ও তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহতের ছেলে হাফিজুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবা শুধু পথ দিয়ে যাতায়াত করতে চেয়েছিল। এর জন্য তাকে জীবন দিতে হলো। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’
শ্যামনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ বিপ্লব হোসেন জানান, পথের জমি নিয়ে পূর্ব বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে শ্যামনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সিরাজ/মাহফুজ