রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের বাঘিয়া গ্রামে জমির সৌন্দর্য বৃদ্ধির কথা বলে একটি চালুকৃত খাল ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। প্রায় এক মাস আগে খালের প্রায় ১০০ মিটারের বেশি অংশ মাটি ফেলে ভরাট করা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভিযুক্ত দুই ভাই হলেন বাঘিয়া গ্রামের হায়দার মোল্লার ছেলে আতিয়ার রহমান ও আব্দুস সোবাহান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলঘর ইউনিয়নের ছাইবেরে এলাকার মাঠের পানি বের হওয়ার একমাত্র পথ ইলিশা খাল। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল দিয়ে বর্ষা মৌসুমে ছাইবেরে মাঠের পানি প্রবাহিত হয়ে মাশালিয়া বিলে গিয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে নদীতে গিয়ে মিশে। বহু বছর ধরে এলাকার কৃষকরা এই খালের পানি ব্যবহার করে কৃষিকাজ করে আসছেন। এছাড়া পাট পচানোর কাজেও এই খালের পানি ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, তারা জন্মের পর থেকেই এই খাল দেখে আসছেন। আগে খালটি অনেক প্রশস্ত ছিল, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভরাট হয়ে এখন ছোট হয়ে গেছে। তবুও প্রতিবছর সংস্কার করার ফলে খালটি সচল থাকে।
খালটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘ইলিশা খাল পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি’ নামে একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটির উদ্যোগে ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সবশেষ খালটি সংস্কার করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এই সংস্কার কার্যক্রম ও কমিটির তদারকি করে থাকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত দুই ভাই প্রভাবশালী হওয়ায় বিভিন্ন দপ্তরকে প্রভাবিত করে খালটি ভরাট করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালটি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে। মূলঘর ইউনিয়নের বাঘিয়া ব্রিজের দক্ষিণ দিক থেকে প্রায় ১০০ মিটারের বেশি এলাকা মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। খাল ভরাটের পর ইংরেজি ‘এল’ আকৃতিতে পূর্ব পাশে ব্যক্তিগত জমির উপর দিয়ে ড্রেনের মতো করে পানি বের হওয়ার একটি বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে অন্যের জমির উপর দিয়ে পানি চলাচলের পথ তৈরির চেষ্টা করায় একই গ্রামের সবুজ মোল্লা নামের এক ব্যক্তি আদালতে মামলা করেন। রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৪ ধারায় মামলা করা হলে আদালত ওই স্থানে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন।
মূলঘর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমি ১৯৯৮ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। ওই বছরই প্রথম সরকারিভাবে এই খালটি সংস্কার করা হয়। খালটি বন্ধ হয়ে গেলে আশেপাশের অনেক জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। সরকার যেখানে খাল খনন করেছে, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে খাল বন্ধ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে অনেক আগেই প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।’
অভিযুক্ত আতিয়ার রহমান বলেন, ‘খালের এই অংশটি আমাদের ব্যক্তিগত জমির ওপর। রাস্তা নির্মাণের সময় এই খাল কাটা হয়েছিল। রাস্তা আর জমির মাঝখানে খাল থাকার কারণে জমির সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা জমির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য খালটি ভরাট করেছি। তবে আমরা বিকল্পভাবে পানি বের হওয়ার একটি পথ তৈরি করেছি। একজন মামলা করেছে। মামলা শেষ হলে বাকি কাজ শেষ করব।’
কিছু সময় পর সেখানে উপস্থিত হন অপর অভিযুক্ত আব্দুস সোবাহান। তিনি বলেন, ‘আমি এক সময় এই খাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্পাদক ছিলাম। আমাদের জমি আর রাস্তার মাঝখানে খাল থাকার কারণে চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। তাই খালটি আমাদের জমির পেছন দিক দিয়ে কেটে দেওয়ার চেষ্টা করছি যাতে আমাদের চলাচলের সুবিধা হয়। এতে আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানান তিনি।’
ইলিশা খাল রক্ষণাবেক্ষণ কমিটির সভাপতি আব্দুল করিম বলেন, ‘খালটি এলাকার কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ব্যক্তিগত জমির দাবি করে খাল বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা একাধিকবার প্রতিবাদ করেছি কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি।’
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পায়রা চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাজবাড়ীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। আপনার কাছ থেকে জানলাম। এখনই আমাদের লোক পাঠিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সুমন বিশ্বাস/অমিয়/