দেশের গ্রামবাংলায় এখনো ছড়িয়ে আছে জমিদারি আমলের নানা নিদর্শন। কালের প্রবাহে অনেক স্থাপনা হারিয়ে গেলেও কিছু স্থাপত্য আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে রয়েছে এমনই এক বিস্মিত স্থাপনা ‘হাজারদুয়ারি প্রাসাদ’। এক সময়ের দাপুটে জমিদারি ও আভিজাত্যের প্রতীক এই স্থাপনাটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। তবে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে এটি এখনো বহন করছে শত বছরের ইতিহাস ও গল্প।
যুগিপাড়া ইউনিয়নের বীরকুতসা গ্রামে অবস্থিত এই প্রাসাদটি ছিল আত্রাই অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের আবাস ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই প্রাসাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদার রাজা গোপাল ধাম ও তার জামাতা বিরেশ্বর ব্যানার্জির নাম। তার একমাত্র কন্যা প্রভাতী বালার বিয়ের মাধ্যমেই এই প্রাসাদের ইতিহাসের সূচনা হয়।
স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাবিয়া হক জানান, একবার জমিদারি কাজে রাজা গোপাল ধাম তীর্থভ্রমণে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন বিরেশ্বর ব্যানার্জি নামে এক স্থানীয় যুবক তার সেবা-যত্ন করেন। ওই যুবকে মুগ্ধ হন রাজা। পরে তার সঙ্গে নিজের কন্যা প্রভাতী বালাকে বিয়ে দেন। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে দেওয়া বিপুল অর্থেই বীরকুতসা গ্রামে নির্মিত হয় এই বিশাল রাজপ্রাসাদ।
ভারতের মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারি প্রাসাদ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে প্রভাতী বালার শর্ত ছিল–দুটি প্রাসাদ যেন একই রকম না হয়। সেই শর্ত মেনেই নির্মিত হয় বীরকুতসার এই প্রাসাদ, যা ‘হাজার দরজার প্রাসাদ’ নামে পরিচিত হলেও এতে ছিল না কোনো জানালা।
প্রাসাদটি প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত, যার মূল ভবন দুই একর জমির ওপর দোতলা হিসেবে নির্মিত। প্রাসাদে অসংখ্য দরজা, করিডর ও বিশাল কক্ষ রয়েছে। প্রাসাদের ভেতরে তিনটি উঠান, প্রশাসনিক দপ্তর, বিচার কক্ষ, খাজনা ঘর ও মোহাফেজখানা ছিল। অতিথিদের থাকার জন্য আলাদা কক্ষ ও বিনোদনের জন্য ছিল বিশাল নাচঘর।
প্রাসাদটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা রোমাঞ্চকর গল্প প্রচলিত আছে। স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম কুমার প্রামাণিক জানান, জমিদার আমলে সাধারণ মানুষ প্রাসাদের সামনে জুতা পরে বা ছাতা নিয়ে যেতে পারত না। জমিদারদের সম্মান দেখাতে দূর থেকে জুতা খুলে হেঁটে যেতে হতো। এমনকি একবার একটি পালিত হাতি রাজপুত্রকে গিলে ফেলার মতো মর্মান্তিক লোককথাও এখনো গ্রামবাসীর মুখে মুখে ফেরে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে গেলে প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়। পরে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ছাদ ধসে পড়ছে, দেয়ালে জন্মেছে পরগাছা।
দর্শনার্থী আতিক মাহমুদ বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। দ্রুত সংস্কার করা হলে প্রাসাদটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।’ প্রাসাদটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে যুগিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এম মাজিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘এটি ঐতিহাসিক সম্পদ। সরকার এটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড় তুললে এলাকার অর্থনীতি ও পর্যটনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, প্রাসাদটি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।