মাউন্ট এভারেস্টে নিখোঁজ হওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন নেপালের এক পর্বতারোহী। হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বেঁচে থাকার জন্য কেবল ‘বরফ চিবিয়ে’ দিন পার করেছেন। এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযান পুরো পর্বতারোহী মহলকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
৫৭ বছর বয়সী প্রবীণ গাইড দাওয়া শেরপা গত ৩০ মে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের ওপরের ঢালে নিখোঁজ হন। তখন পর্বতচূড়ায় আর কোনো আরোহী ছিলেন না এবং তাঁর অক্সিজেনও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় কোনো খোঁজ না মেলায় তাঁর পরিবার বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে ধর্মীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রার্থনাও শুরু করে দিয়েছিল।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে গত শুক্রবার বিবিসিকে দাওয়া শেরপা বলেন, ‘আমি ভাবিনি যে আর কখনো বেঁচে ফিরব। ভেবেছিলাম এভাবেই মরে যাব। আমি আসলে পথ হারাইনি। অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে আমি দল থেকে পিছিয়ে পড়েছিলাম। আর অক্সিজেন ছাড়া আমি এক পা-ও হাঁটতে পারছিলাম না।’
এভারেস্টের অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অক্সিজেনশূন্য ‘ডেথ জোন’-এর তীব্র ঠান্ডার মধ্যে আটকা পড়েছিলেন তিনি। কোনো খাবার ও পানি ছাড়াই সেখানে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। দাওয়া বলেন, ‘প্রথম দুই দিন আমি কিছুই খাইনি। এরপর তৃষ্ণা মেটাতে শক্ত বরফ চিবানো শুরু করি। এতে আমার দাঁত খুব ব্যথা করছিল, তাও আমি জোর করে বরফ চিবিয়েছি।’ এ ছাড়া পকেটে থাকা সামান্য কিছু চকলেট ও স্ন্যাক্স পানিতে ভিজিয়ে খেয়েছিলেন তিনি।
পর্বতারোহী মহলে ‘হিলারি’ নামে পরিচিত দাওয়া শেরপা জানান, একপর্যায়ে তিনি বরফের গভীর ফাটলে পড়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে নিজেই বেয়ে ওপরে ওঠেন।
আনন্দ ও ক্ষোভের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ফাটল থেকে বের হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে দাওয়া বলেন, ‘তুষারের ওপর পা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম এবং ওপরের দিকে তাকালাম। মনে হলো আমি এখান থেকে বের হতে পারব। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি দড়ি পেলাম। সেটি ধরে ফাটল থেকে বেরও হলাম এবং নিচেও নেমে এলাম।’
বেস ক্যাম্পের উদ্দেশে তিনি দিন-রাত অবিরাম হাঁটতে থাকেন। অবশেষে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর গত ৪ জুন সকালে সাগরমাথা পলিউশন কন্ট্রোল কমিটির (এসপিসিসি) একটি পরিচ্ছন্নতাকর্মী দল তাঁকে বেস ক্যাম্পের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে আসতে দেখে। দলটির সদস্যরা মূলত পর্বত পরিষ্কার করতে ওপরে উঠছিলেন। তাঁরা দাওয়াকে উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তীব্র তুষারক্ষত, প্রচণ্ড পানিশূন্যতা এবং পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাঁকে দ্রুত হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুর হ্যামস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি আশঙ্কামুক্ত। তাঁর মেয়ে মেন্ডো লামু শেরপা এএফপিকে বলেন, ‘বাবা এখন ভালো আছেন। আমাদের মধ্যে কথাও হয়েছে।’
দাওয়ার এই বেঁচে ফেরা যেমন সহকর্মী পর্বতারোহীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়েছে, তেমনি তাঁর পরিবারের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ–উদ্ধারকারী দল সময়মতো খোঁজাখুঁজি করেনি। নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফুর গেলজে শেরপা একে একটি বিরল অলৌকিক ঘটনা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া উদ্ধার অভিযান নিয়ে তিনি বলেন, ‘কাউকে এভাবে পাহাড়ে ফেলে আসা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অমানবিক কাজ। এর পেছনে কার গাফিলতি ছিল তা তদন্ত করে দেখা উচিত।’
উল্লেখ্য, চলতি মরসুমে এভারেস্টে রেকর্ড ১,০০০-এর বেশি আরোহী চূড়ায় পৌঁছালেও অন্তত পাঁচজন পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন। সূত্র : বিবিসি