চারপাশে সবুজের সমারোহ। দূর থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য পাখির ডাক। হঠাৎ ছুটে যাচ্ছে কোনো বন্যপ্রাণী। বনের মাঝখানে সরু রেললাইন। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের এমন চিত্র তৈরি করে এক জীবন ক্যানভাস, যা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন। ছবি তোলেন। কিন্তু এমন সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বিপদ। যে রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে পর্যটকরা ছবি তোলেন, সেটির ওপর দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ছুটে আসতে পারে দ্রুতগামী ট্রেন।
সম্প্রতি দেখা যায়, অনেক পর্যটকই এই রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে কিংবা হেঁটে ছবি তুলছেন। কেউ ভিডিও করছেন, কেউ খুঁজছেন ‘পারফেক্ট ফ্রেম’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজর কাড়ার প্রতিযোগিতা তাদের ঠেলে দিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে। সৌন্দর্যের মুহূর্তটিকে ফ্রেমবন্দি করতে গিয়ে তারা ভুলে যাচ্ছেন, এটি কেবল একটি দৃশ্য নয়, এটির পেছনে রয়েছে অদৃশ্য ঝুঁকি। এই প্রবণতার করুণ উদাহরণ ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বরের ঘটনা। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ রেলপথে লাউয়াছড়া বন এলাকায় সেলফি তোলার সময় ট্রেনের ইঞ্জিনের ধাক্কায় এক শিক্ষার্থী নিহত হন।
স্থানীয় ও রেলসংশ্লিষ্টদের মতে, লাউয়াছড়ার ঘন গাছপালার কারণে রেললাইনের বাঁকগুলোতে দৃষ্টিসীমা কম থাকে। ট্রেন আসার শব্দ অনেক সময় হঠাৎ করেই শোনা যায়। বনভূমির নিস্তব্ধতায় সেই শব্দ ধরা পড়ে দেরিতে, আর ততক্ষণে বিপদ হয়ে ওঠে অনিবার্য।
সুন্দর ছবি ও ভিডিও পোস্ট করার আকাঙ্ক্ষা থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলেন পর্যটকরা। সতর্ক করার পরও অনেকেই তা গুরুত্ব দেন না। বিষয়টি স্বীকার করেন চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা নাফিজ আহমদ।
তিনি বলেন, ‘পারফেক্ট ফ্রেমের জন্য আমরা অনেক সময় সীমা ভুলে যাই। এই জায়গাটা একটা সক্রিয় রেলপথ। এটা মনে রাখা জরুরি।’
তবে আরেক পর্যটক জুনেদ আবেদীন বলেন, ‘এখানে এসে মনে হয়েছে–কেউ যদি আগে থেকেই কঠোরভাবে নিষেধ করত বা নজরদারি থাকত, তাহলে হয়তো অনেকেই রেললাইনে উঠত না।’
সায়ন্তনী দেব এসেছেন খুলনা থেকে। তিনি বলেন, ‘এখানকার পরিবেশ এত সুন্দর যে ছবি তুলতে ইচ্ছা করে। তবে রেললাইন তো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক পাওয়ার চেয়ে নিজের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এটা আমাদের বুঝতে হবে।’
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি। কিন্তু আশপাশে অনেককে রেললাইনে উঠে ছবি তুলতে দেখে চিন্তা হচ্ছে। এটা দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্ধ হওয়া দরকার।’
লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা সাজু মারছিয়াং বলেন, ‘দুই বছর আগে রেলসেতুতে ছবি তুলতে গিয়ে দুই পর্যটক আহত হয়েছিলেন। পর্যটকরা লাইনম্যানের কথা শোনেন না। বছর দুই আগে এক ছাত্র মারা গেল, তবু সচেতনতা নেই। একটি নিখুঁত ছবির চেয়ে একটি নিরাপদ জীবন অনেক বেশি মূল্যবান, এই উপলব্ধিটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’
পর্যটকরা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাতেই ছবি তুলছেন জানিয়ে শ্রীমঙ্গলের স্টেশন মাস্টার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বনের ভেতর রেললাইনের ওপর বা চলন্ত ট্রেনের খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘পর্যটন মৌসুমে রেললাইনের ওপর ঝুঁকি নিয়ে ছবি তোলা বন্ধ করতে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’