দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে রাজশাহী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনহীন অবস্থায় থাকলেও নিয়ম ভেঙে তহবিলের টাকা তোলা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক ব্যাংক স্টেটমেন্টে তহবিল থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য উঠে আসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী কলেজে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হন। ভর্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ২৫ টাকা করে ছাত্র সংসদের তহবিলে জমা দিতে হয়। ফলে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ টাকা করে এই তহবিলে যুক্ত হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ধরে জমতে জমতে বর্তমানে ব্যাংক হিসেবে জমা রয়েছে এক কোটি সাড়ে ১১ লাখ টাকা। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া এই অর্থ উত্তোলনের বিধান না থাকলেও, সাম্প্রতিক এক ব্যাংক স্টেটমেন্টে তহবিল থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য উঠে আসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতে এই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের এবং টাকা উত্তোলনে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
নগরীর রূপালী ব্যাংক কাজী নজরুল ইসলাম শাখার একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে ৫৯ হাজার ৩৭২ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই সময়ে ওই অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এ তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কার অনুমতিতে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, কোন খাতে ব্যয় হয়েছে এবং এতে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন হয়েছে কি না–যদিও এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
কলেজের শিক্ষার্থী জুবায়ের রশিদ বলেন, ‘আমাদের ভর্তি নেওয়ার সময় বলা হয় এই টাকা ছাত্র সংসদের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার হবে এবং কোনোভাবেই ব্যক্তিগতভাবে তোলা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে, তা আমরা জানি না। অ্যাকাউন্টে কত টাকা জমা আছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে–এসব বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রশাসনের দায়িত্ব।’
আরেক শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ২৫ টাকা করে দিচ্ছে। কিন্তু এই টাকার কোনো দৃশ্যমান ব্যবহার নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচনও হচ্ছে না, আবার তহবিল থেকেও টাকা উঠছে–এটা খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। আমরা চাই দ্রুত তদন্ত করে পুরো হিসাব শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ করা হোক।’
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাঈদ হাসান। তিনি বলেন, ‘ছাত্র সংসদ একটি গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিক্ষার্থীদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই তহবিল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেবেন–এটাই নিয়ম। সেখানে ৩২ বছর ধরে নির্বাচন বন্ধ রেখে প্রশাসনিকভাবে তহবিল পরিচালনা করা এবং অর্থ উত্তোলন করা গঠনতন্ত্রের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু আর্থিক অনিয়মের প্রশ্নই তোলে না, বরং শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকারও ক্ষুণ্ন করে। অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি দ্রুত ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. ইব্রাহিম আলী প্রথমে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজে বর্তমানে ২৪টি বিভাগে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এখানে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে। এর পর তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আর কোনো নির্বাচন হয়নি।