দেশের তিন বিভাগের মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসার জায়গা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। অথচ গত দেড় বছর ধরে এখানে জীবনরক্ষাকারী জলাতঙ্কের টিকার ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কুকুর, বিড়াল কিংবা অন্য প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা পড়ছেন চরম অনিশ্চয়তায়। বিনামূল্যে টিকা না পেয়ে বাধ্য হয়ে তাদের ছুটতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসিতে। সেখানে টিকার দাম অনেকের সাধ্যের বাইরে।
রামেক হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ এখানে জলাতঙ্কের টিকার আশায় ভিড় করছেন। কিন্তু হাসপাতালে কোনো র্যাবিস ভ্যাকসিন নেই।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকেই টিকা সরবরাহে জটিলতা শুরু হয়। আর গত ছয় মাস ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একেবারেই কোনো সরবরাহ আসেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ডোজ টিকা সংগ্রহ করে। কিন্তু রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে, সেই মজুতও ৩ সপ্তাহ আগেই শেষ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ রোগী এখানে জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসেন। সেই হিসেবে মাসে প্রয়োজন পড়ে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার ডোজ টিকার। অথচ সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় এই বিশাল চাহিদা পূরণ করা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা এ-সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। রাজশাহী নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার সাহাবুর আলীর মেয়েকে কুকুরে কামড়ানোর পর প্রথম দুই ডোজ বিনামূল্যে পেলেও পরবর্তী ডোজ কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে। সামনে আরও ডোজ বাকি। কিন্তু টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আলী হোসেন নামের এক তরুণ হাসপাতাল থেকে টিকা না পেয়ে বিকাশে টাকা এনে ফার্মেসিতে খোঁজ করেও ব্যর্থ হন। হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘টাকা জোগাড় করলাম, কিন্তু অনেক ফার্মেসি ঘুরেও টিকা তো পেলাম না। এখন কী করব, বুঝতে পারছি না। তাই বাকি ফার্মেসিগুলোতেও খোঁজ করতে যাচ্ছি।’
পুঠিয়ার ভ্যানচালক জুয়েল রানা তার তিন বছরের শিশুকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। প্রতিটি ডোজের জন্য বাইরে থেকে টিকা কিনতে হচ্ছে, সঙ্গে রয়েছে যাতায়াত খরচ। তার মতো নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।
চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্ক একটি শতভাগ প্রাণঘাতী রোগ। একবার উপসর্গ দেখা দিলে বাঁচার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নেওয়া জরুরি। সাধারণত প্রথম ডোজের পর তৃতীয়, সপ্তম ও ১৪তম দিনে টিকা নিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে ৯০ দিন পর্যন্ত মোট ছয় ডোজ প্রয়োজন হয়। কিন্তু টিকাসংকটের কারণে অনেক রোগী নির্ধারিত সময়মতো ডোজ নিতে পারছেন না, যা তাদের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
চিকিৎসকদের মতে কুকুর, বিড়াল, বানর, বেজি, বাদুড় ও শিয়ালের কামড় বা আঁচড় থেকে জলাতঙ্ক-সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে ‘পাগলা’ কুকুরের কামড়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে জলাতঙ্ক টিকার উৎপাদন বন্ধ নেই। বরং শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত টিকা উৎপাদন করছে এবং বাজারে সরবরাহ রয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের রাজশাহী ডিপোর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদা অনুযায়ী বাজারে টিকা সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ সংকট মূলত সরকারি ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে হচ্ছে।
সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘টিকাসংকট নিরসনে আমরা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখায় একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে কিছু টিকা সংগ্রহ করেছিলাম, সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সরবরাহ পাওয়া যাবে।’