মাদারীপুর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আড়িয়াল খাঁ নদ। এক সময়ের প্রমত্তা এই নদ দিয়ে প্রতিদিন মাদারীপুর থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ চলাচল করত। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যের জন্য এই নৌপথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
এখন এই পথে আর লঞ্চ চলে না। তবে লঞ্চঘাটটি আজও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। লঞ্চঘাটের বিপরীত পাশে রয়েছে সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের মহিষেরচর গ্রাম।
কৃষিনির্ভর এই এলাকার অধিকাংশ মানুষকে ফসল বিক্রি, শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনে প্রতিদিন শহরে যাতায়াত করতে হয়। আর এই যাতায়াতে তাদের একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার।
শুধু পাঁচখোলা ইউনিয়ন নয়, উপজেলার কালিকাপুর ও ছিলারচর ইউনিয়নের বাসিন্দারাও দীর্ঘদিন ধরে এই নৌপথ ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে এখনো সেতু নির্মাণ না হওয়ায় যাতায়াতকারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে গেলে কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়, এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যায়। স্থানীয়রা বছরের পর বছর ধরে এখানে একটি সেতু বানানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদনও করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি। এখানে কোনো সেতু নির্মাণ করা হয়নি। স্কুলশিক্ষার্থীসহ সব বয়সী মানুষের দাবি, গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা হোক। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেও মিলেছে দ্রুত কাজ শুরুর সেই পুরোনো আশ্বাস।
স্থানীয়দের দাবি, আড়িয়াল খাঁ নদে একটি সেতু নির্মাণ হলে তিন ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে, বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ। পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও জরুরি সেবায়ও গতি আসবে। তাই দ্রুত সেতু নির্মাণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
পাঁচখোলা ইউনিয়নের একটি হাইস্কুলের শিক্ষার্থী নারগিস। ট্রলারের ওপর ইউনিফর্ম পরে বসে আছে। অপেক্ষা করছিল ট্রলার ছাড়ার। বলে, ‘আমরা প্রতিদিন ট্রলারে চড়ে গ্রাম থেকে শহরে যাই। এই সময়টাতে আমরা খুবই ভয়ে থাকি। কখনো কখনো ট্রলারে থাকা অবস্থায় ঝড় শুরু হয়। এমন সময়ে নৌপথে চলাচল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার যদি এখানে একটি সেতু বানিয়ে দিত, তা হলে সবার মতো আমাদের মতো শিক্ষার্থীদেরও বেশ সুবিধা হতো।’
লঞ্চঘাটে ট্রলারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জয়নাল ব্যাপারী। বাড়ি মহিষেরচর গ্রামে। তিনি বলেন, ‘আড়িয়াল খাঁ নদের এই পথে সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ যাতায়াত করে। এখানে একটি সেতু নির্মাণ হলে মানুষের জীবনমান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন হবে। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত এখানে একটি সেতু নির্মানের দাবি জানাই।’
আরিফুর রহমান নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘নৌপথে গ্রামের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে হয়। এ জন্য শহরে বাসা নিয়েছি। যদি এখানে একটি সেতু থাকত, তা হলে আমি বাবা-মা ও স্ত্রীকে নিয়ে এক বাড়িতে থাকতে পারতাম। এখন শহরে বাসা নিয়ে থাকাও কষ্টকর। একদিকে অর্থের অপচয়, অন্যদিকে বাবা-মা থেকে আলাদা থাকা। সব মিলিয়ে একটি সেতু থাকলে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।’
পাঁচখোলা ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রুবেল হাওলাদার বলেন, ‘আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। প্রায় এক যুগ ধরে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও স্মারকলিপি জমা দিয়ে আসছে। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।’
মাদারীপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কীর্তনীয়া বলেন, ‘লঞ্চঘাট এলাকায় একটি সেতু নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। কিছু তথ্য ও মৌজার ম্যাপ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেতু নির্মাণ সম্ভব হবে।’