পাঁচ মাসের শিশু তাহসিনকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বসেছিলেন মা তাসলিমা বেগম। শিশুটির ছোট দুটি হাত বারবার কাশির কারণে কেঁপে উঠছিল। পাশে বসে থাকা বাবা সাইফুল মৃধার চোখেমুখে ক্লান্তি আর অনিদ্রার ছাপ। এক মাসের বেশি সময় সন্তানকে নিয়ে এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতালে ছুটছেন তিনি।
প্রথমে নিউমোনিয়া, পরে হাম। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে এখন প্রায় সর্বস্বান্ত এই প্রান্তিক কৃষক। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাহসিনের বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার মহিষাদী গ্রামে।
তাহসিনের বাবা সাইফুল মৃধা বলেন, ‘শুরুর দিকে ভেবেছিলাম সর্দি-কাশি। পরে শ্বাসকষ্ট বাড়লে হাসপাতালে ভর্তি করি। এখন ডাক্তার বলছেন, হামও হয়েছে। জমিজমা যা ছিল, বন্ধক রাখতে হয়েছে। এখন মানুষের কাছে হাত পাতা ছাড়া উপায় নেই। বর্তমানে ছেলের চিকিৎসা চলছে ধার দেনা, আত্মীয়স্বজনের সহায়তা ও স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে।’
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে ১৪ মাস বয়সী আরমান। তার বাবা আবুল হোসেন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় রাজমিস্ত্রির সহকারী। সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে টানা দুশ্চিন্তা, নির্ঘুম রাত ও আর্থিক চাপে তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কয়েক দিন ধরে তিনিও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আরমানের মা আসমা বেগম বলেন, ‘একদিকে ছেলের চিকিৎসা, অন্যদিকে সংসার। কাজ না করলে আয় নেই। আবার হাসপাতালে থাকলে বাড়িতে কেউ নেই। কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।’
হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সব ওষুধ হাসপাতালে পাওয়া যায় না। অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক, নেবুলাইজারের সল্যুশনসহ জরুরি কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে প্রতিদিন সাধারণ রোগীদের ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। নিউমোনিয়া বা অন্য জটিলতা থাকলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার বেশি।
তাহসিনের মা তাসলিমা বেগম বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে ঠিকমতো ওষুধ দেয় না। বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে কিনতে টাকা শেষ। এখন ধার না করলে চিকিৎসা চালানো যাবে না।’
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘হামের চিকিৎসায় সাধারণত ব্যয়বহুল পরীক্ষা লাগে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখেই চিকিৎসকরা রোগ শনাক্ত করেন। তবে জটিলতা বোঝার জন্য কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি), হামের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে বা নাক-গলার সোয়াব পরীক্ষা করাতে হয়। সরকারি হাসপাতালে এসব পরীক্ষায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই পরীক্ষায় খরচ পড়ে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা।’
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেন, হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের তেমন সংকট নেই। তবে রাতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। সেটা সাময়িক সময়ের জন্য। এ ছাড়া হামের জটিলতা বোঝার জন্য যেসব পরীক্ষা করানো হয়, সেগুলো হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সরকারি ল্যাবেই হয়ে থাকে। রোগীর স্বজনদের আমরা হাসপাতাল থেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়ে থাকি।’
রোগীর স্বজনরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি একটি শিশুর সঙ্গে সাধারণত দুজন অভিভাবককে থাকতে হয়। ভর্তি রোগীর সঙ্গে একজন স্বজনের খাবার সরবরাহ করা হলেও অন্যজনের খাবার বাইরে থেকে কিনতে হয়। এ ছাড়া যাতায়াত ও থাকার খরচ মিলিয়ে ৭ থেকে ১৫ দিনের চিকিৎসায় অতিরিক্ত ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে হাম আক্রান্ত একটি শিশুর পেছনে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।’
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ রোগীর পরিবারই নিম্নআয়ের। কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ আবার ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালান। সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাদের অনেকেই এখন ঋণের ভারে জর্জরিত।
এদিকে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) লোকমান হাকিম বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবার জন্য বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। বিভাগের কোনো হাসপাতালেই ওষুধের সংকট নেই।’ তিনি আরও বলেন, যেসব হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছে, সেসব হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।