যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।...
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকাল একটি নতুন দৃশ্য খুবই পরিচিত। একসময় যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া, ব্যাংকার হওয়া কিংবা দেশের কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া, সেখানে এখন অনেকের প্রধান লক্ষ্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই আমি রিকমেন্ডেশন লেটার লিখি। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করছে, কেউ কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। শিক্ষার্থীদের আলোচনায় এখন গবেষণা প্রস্তাবনা, স্কলারশিপ, আইইএলটিএস, জিআরই, পাবলিকেশন এবং অধ্যাপকদের ই-মেইল যোগাযোগের বিষয়গুলোই বেশি স্থান পায়।
এটি একদিকে আশাব্যঞ্জক। কারণ বাংলাদেশের তরুণরা এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে– এই মেধাবী তরুণদের বড় অংশ যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ওই রাষ্ট্রের দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদের সবচেয়ে যোগ্য অংশ যখন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।অনেকে মনে করেন বিদেশে যাওয়ার মূল কারণ উন্নত শিক্ষা। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী মনে করে যে তাদের ভবিষ্যৎ এখানে যথেষ্ট নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল করেও চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং প্রতিযোগিতামূলক। দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি নানা অদৃশ্য বাস্তবতাও কাজ করে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ওএসডি সংস্কৃতি কিংবা পদোন্নতির অনিশ্চয়তা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বেসরকারি খাতেও উচ্চশিক্ষিত গবেষক বা বিশেষজ্ঞদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, বিদেশে তার দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই সেই পথ বেছে নিতে চায়।
আরও একটি বড় কারণ হলো গবেষণার পরিবেশ। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিভাবান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেও গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সহায়তা এবং গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার কাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূর্ণ স্কলারশিপ, গবেষণা অনুদান, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমানের গবেষণা সুবিধা প্রদান করছে। ফলে সিদ্ধান্তটি অনেক সময় আবেগের নয়, বাস্তবতার হয়ে ওঠে।
আজকের উন্নত দেশগুলোও একসময় মেধা পাচারের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৭০ ও ’৮০-এর দশকে ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে চলে যান। একসময় একে ভারতের জন্য বড় ক্ষতি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত তথ্যপ্রযুক্তি খাত, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা পরিবেশ উন্নত করে। ফলে বিদেশে থাকা ভারতীয় মেধাবীদের একটি অংশ দেশে বিনিয়োগ শুরু করে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং জ্ঞান স্থানান্তরে ভূমিকা রাখে।
চীন আরও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে। বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করা গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা বিশেষ গবেষণা অনুদান, উচ্চ বেতন, আবাসন সুবিধা এবং স্বাধীন গবেষণার সুযোগ দেয়। এর ফলে হাজার হাজার বিজ্ঞানী দেশে ফিরেন আসেন এবং চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছে। তারা বুঝেছিল, মেধাবীদের বিদেশযাত্রা থামানো সম্ভব নয়; কিন্তু দেশে ফিরে আসার জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী? বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘সিলেকটিভ ব্রেইন ড্রেইন’। অর্থাৎ সবার আগে দেশ ছাড়ছে সবচেয়ে মেধাবী, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতাসম্পন্ন তরুণরা। যখন একজন অসাধারণ গবেষক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা নীতিনির্ধারণী দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যান, তখন দেশ কেবল একজন নাগরিককে হারায় না; বরং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাকেও হারায়।
একজন বিজ্ঞানী হয়তো একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারতেন। একজন অর্থনীতিবিদ হয়তো নতুন নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারতেন। একজন শিক্ষক হয়তো শত শত শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। তাদের অনুপস্থিতি সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর।
তাহলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকারের কী করা উচিত? এর উত্তর যদি সাজাতে চাই তাহলে এভাবে দেখা যেতে পারে– প্রথমত, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে একজন তরুণ বিশ্বাস করবে যে তার পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ব্যয় এখনো অত্যন্ত কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত মেধাবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। দেশে ফিরে আসা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য দ্রুত নিয়োগ, গবেষণা তহবিল এবং কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে হবে। যাতে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে যে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশেও সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা মানুষের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিদেশে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয়। জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীকে জানার বিকল্প নেই। তবে প্রশ্ন হলো, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কি দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে? সবাই দেশে ফিরে আসবে– এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু বিদেশে থেকেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা করা, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া, প্রযুক্তি বিনিয়োগ করা কিংবা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মেধাবী, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেশি বৈশ্বিক। এটি আমাদের শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি যদি ক্রমাগত দেশের বাইরে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের গতি একসময় বাধাগ্রস্ত হবে।
মেধা পাচার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সীমান্ত বন্ধ করা নয়, বরং সুযোগ সৃষ্টি করা। তরুণদের এমন একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে যেখানে তারা অনুভব করবে– যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
