উপপরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে ১ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) গাইবান্ধা কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা আনিছুর রহমানসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুুদক)।
এ নিয়ে গত ২২ অক্টোবর দৈনিক খবরের কাগজের প্রিন্ট ভার্সনে ১১ নং পাতায় 'অর্থ আত্নসাতে দুদকের মামলা,আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। গতকাল সেই মামলার প্রধান আসামি আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যার দিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা ডিবি পুলিশের ওসি ফেরদাউস আহমেদ ।
তিনি বলেন, মামলার পর প্রধান আসামি আনিছুর রহমান পলাতক ছিলেন। গত রবিবার বিকেলে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানীর সাভারের রাজাসন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এই মামলার এই প্রথম একজন আসামি গ্রেপ্তার করা হল। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে প্রকাশিত সংবাদ
উপপরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে ১ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) গাইবান্ধা কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা আনিছুর রহমানসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুুদক)। দুদক সমন্বিত জেলা রংপুর কাযালর্য়ের কার্যক্রম অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। আদালত থেকে আসামি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তবে থানায় তা ফাইল পযন্তর্ই রয়েছে সীমাবদ্ধ। এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে মামলার আসামিরা আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলার প্রধান আসামি চাকরিচুত আনিছুর রহমানসহ অন্যান্য আসামির এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উল্টো বিআরডিবির গাইবান্ধা কার্যালয়ের কর্মচারিদের মারধর ও বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন আসামিরা।
মামলা সুত্রে জানা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আসামি আনিছুর রহমান গাইবান্ধা বিআরডিবির জেলা কার্যালয়ে হিসাব রক্ষক দায়িত্বে ছিলেন।এই দীর্ঘ কর্মকালে তিনি চারজন উপপরিচালকের স্বাক্ষর (স্ক্যানের মাধ্যমে) জাল জালিয়াতি করেন। দুদকের তদন্তে এটি প্রমাণিত হয়েছে। এ সময়ে অভিযুক্ত আনিছুর রহমান জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের বেতন ভাতা,পেনশন, কল্যাণ তহবিল (রাজস্ব) থেকে মোট ১ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। রাজশাহী কৃষি ব্যাংক গাইবান্ধা শাখায় ডিডিবিআরডিবি নামের একটি ব্যাংক হিসাবে খুলে এসব লেনদেন করেন।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে জেলায় সাড়ে পাঁচ বছর মেয়াদী ‘গাইবান্ধা সমম্বিত পল্লী দারিদ্র দুরীকরন কর্মসূচি’ নামের একটি প্রকল্প দেয় সরকার। সেই প্রকল্পের পল্লী বাজার নামে ৯ লক্ষ ৭৪ হাজার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) বিআরডিবি ব্যাংকে জমা রাখে। এভাবেই প্রকল্পের কার্যক্রম চলতে থাকে। তবে উপপরিচালকগণ আনিছুর রহমানের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
এরপর ২০১৮ সালের মার্চে গাইবান্ধা জেলা বিআরডিবির উপপরিচালক পদে যোগদান করেন আব্দুস সবুর। তিনি গাইবান্ধা সমম্বিত পল্লী দারিদ্র দুরীকরন কর্মসূচির পল্লী বাজারের ৯ লক্ষ ৭৪ টাকা আনিছুর রহমান তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেন।
কর্মসূচির টাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসেবে স্থানান্তর করার বিষয়টি সন্দেহ হলে উপপরিচালক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্তে আনিছুর রহমানের টাকা আত্মসাতের বিষয় উঠে আসে। এ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরে বিআরডিবির প্রধান কার্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
সেই তদন্তে হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা আনিছুর রহমানের অর্থ আত্নসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। পরে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর আনিছুর রহমানের চাকরি চলে যায়।
পরে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে টাকা আত্নসাতের সত্যতা নিশ্চিত হয়ে দুদক সমন্বতি জেলা কার্যালয় রংপুরের উপসহকারী পরিচালক মো: রুবেল হোসেন বাদি হয়ে ২৪ সালের ২১ অক্টোবরে গাইবান্ধা বিশেষ আদালতে আনিছুর রহমানকে প্রধান আসামী করে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
পরর্বতীতে তদন্তের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি দুদকের নিকট প্রমাণিত হলে আনিছুর রহমানকে প্রধান আসামি করে সাতজনের নামে আদালতে চুড়ান্ত চার্জশীট দাখিল করে দুদক।
পরে আদালত চলতি মাসের ২৭ আগষ্ট আনিছুর রহমানসহ সাত আসামি বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আদালত থেকে গত ২৫ সেপ্টেম্বরে গাইবান্ধা সদর থানায় ওয়ারেন্টটি আসলেও অদ্যবদি আসামিকে গ্রেপ্তারের কোন দৃশ্যমান তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
বাকি ছয় আসামি হলেন, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা রেজাউল করিম, নজরুল ইসলাম, কমলেশ চন্দ্র প্রামানিক, জাকির হোসেন, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তা লায়লুন নাহার বেগম, শাহ মো. বজলুল করিম।
জানতে চাইলে সদর থানার ওসি মো. শাহীনুর ইসলাম তালুকদার বলেন, 'ইতিমধ্যে আসামি গ্রেপ্তারের জন্য তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় আসামির লোকেশন নজরদারীতে রাখা হয়েছে। আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে।
রফিক খন্দকার/মৌসুমী/