কৃষি উদ্যোক্তা অশোক কুমার সরকার। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ছোট গয়েশপুর গ্রামের মৃত কৃষক অমল চন্দ্র সরকারের ছেলে। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছেন। উচ্চশিক্ষায় গ্রহণ করেও চাকরির পেছনে ছুটেননি। বাবার কাজকে ভালোবেসে কৃষিতে দৃঢ়ভাবে মনোনিবেশ করেন। চলতি বছর কয়েক লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেন তিনি। তার কঠোর পরিশ্রম এনে দিয়েছে সাফল্য। তার ওই সাফল্য স্থানীয় কৃষিক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
অশোক কুমার সরকার প্রথম দিকে এবার ৫০ শতাংশ জমিতে ‘বিজলী ২০২০’ জাতের মরিচ চাষ করে এলাকায় বেশ সারা ফেলেছেন। পরিবেশবান্ধব মালচিং পেপার ব্যবহার করে তিনি স্বল্প সময়ে উচ্চমূল্যের মরিচ চাষে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন।
শুধু মরিচ নয়, ওই যুবক কৃষক অভিনব পদ্ধিতে পুঁইশাক, পটল, করলা, বেগুনও চাষ করেন। এক জমিতেই কয়েক প্রকার ফসল ফলান তিনি। পরিবেশবান্ধব মালচিং পেপার ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি অতি দ্রুততার সঙ্গে উচ্চমানের ফলন পেয়েছেন। সারা বছর কাঁচা মরিচ বিক্রি করছেন। এ পদ্ধিতে মরিচ চাষ করে ভালো দাম পেয়েছেন। ধানের চেয়ে আয় বেশি। দেড় বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করে ইতিমধ্যে ১ লাখ টাকার মরিচ বিক্রি করেছেন। উচ্চ ফলনশীল ‘বিজলী ২০২০’ জাতের কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও জেলার হাট বাজারগুলোতে ৪০০ টাকারও বেশি প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি হয়েছিল। এতে অশোক কুমারের লাভের পরিমাণ বেড়েছে।
পরিবেশবান্ধব মালচিং পেপার ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে যুবক কৃষক অশোক কুমার সরকার বলেন, ‘সাধারণভাবে মরিচ চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায় না। নানাভাবে গাছ পচে নষ্ট হয়ে যায়। তবে মালচিং পেপার ব্যবহারে দ্বিগুণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এ পদ্ধতিটি গাছকে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অতি বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে, সারের অপচয় রোধ করে, আগাছা দমন করে এবং মাটির আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ফলন ভালো পাওয়া যায়।’
ইউটিউব দেখে মরিচের জাত সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর প্রথমে ১০ শতক জমিতে চাষ করে ভালো ফলন পান। এরপর তিনি সারা বছর ওই পদ্ধিতে মরিচ চাষ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘দেড় বিঘা জমিতে প্রায় ১০ হাজার টাকার মালচিং পেপার লেগেছে। সব মিলে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। এক বিঘা জমি থেকে অন্তত ১২০ মণ কাঁচা মরিচ উৎপাদন হয়ে থাকে। বর্তমানে ২০ শতক জমিতে পটল, ৩৩ শতক জমিতে বেগুন ও ২০ শতক জমিতে মরিচের চারা রোপণ করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিউল আলম বলেন ‘মালচিং পেপার ব্যবহারের ফলে মরিচের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এটি গাছের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং ফলন বাড়ায়। কৃষক লাভবান হয়।’
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ খোরশেদ আলম বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব মালচিং পেপার ব্যবহারের ফলে মরিচ চাষে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। এ বছর জেলায় ৫৫০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে মালচিং পদ্ধিতে জেলায় ১৮ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের মরিচ চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে সম্ভাব্য কাঁচামরিচ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ১৬৮ টন ধরা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে মরিচের ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরা এবার অনেক খুশি। পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ওই সফলতা কৃষিক্ষেত্রে নতুন একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কৃষক অশোক কুমারের সাফল্য অন্য কৃষকদেরও প্রেরণা দিচ্ছে। এ পদ্ধতি পুরো জেলার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে কাঁচা মরিচ উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।’