জামালপুরে এবার পাটের ভালো ফলন হয়েছে। দামও মিলছে আশানুরূপ। খুশি কৃষকরা। তবে বৃষ্টি কম হওয়ায় পাট পচাতে সমস্যা হচ্ছে। জলাশয়ে নেই পর্যাপ্ত পানি। আঁশ ছাড়াতে কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। কৃষি বিভাগ রিবন রেটিং পদ্ধতির কথা বললেও আগ্রহ কম। এখনো সনাতন পদ্ধতি বেশি জনপ্রিয়। জেলার ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। পাট যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। জমিতে এখন চলছে রোপা আমনের প্রস্তুতি।
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে জামালপুরে বহুদিন ধরে পাট চাষ হয়। একসময় জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলাসহ কয়েকটি এলাকায় বড় বড় পাটকল সচল ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেলেও কৃষকদের আগ্রহ একেবারে থেমে যায়নি। বরং পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক ফসল হিসেবে পাটের চাষ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জামালপুরের সাতটি উপজেলায়- সদর, ইসলামপুর, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ- মোট ২৩ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। চাষ করা জাতের মধ্যে রয়েছে দেশি, তোশা, কেনাফ ও মেস্তা। গত বছর এই পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৮৫ হেক্টর, যা থেকে এ বছর প্রায় ১ হাজার হেক্টর কমেছে।
জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন হচ্ছে ৫ থেকে ৬ মণ পর্যন্ত। আর বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। স্থানীয় কৃষক শফিকুল, আজাদ, ময়নালসহ কয়েকজন জানান, আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি। পাট চাষে খরচ কম, লাভ বেশি।
তবে সমস্যা দেখা দিয়েছে পাট পচানোর ক্ষেত্রে। চলতি বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে পানির অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে পাট জাগ দিতে পারছেন না অনেক কৃষক। এতে আঁশ ছাড়ানোর কাজে দেখা দিয়েছে বড় বিপত্তি। প্রতিবছরই এমন পরিস্থিতির কারণে অনেক কৃষক পাট চাষ থেকে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সদর উপজেলার কৃষক রফিকুল বলেন, ‘জমিতে পাট কেটে রাখছি। কিন্তু পানির অভাবে পচাতে পারছি না। এই সমস্যা প্রতিবছরই হয়। সরকার যদি পাট পচানোর সহজ ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে চাষে আরও উৎসাহ পেতাম।’
পানি সংকট মোকাবিলায় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ‘রিবন রেটিং সিস্টেম’ নামে একটি আধুনিক পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে পানির ব্যবহার অনেক কম হয় এবং দ্রুত আঁশ ছাড়ানো যায়। কিন্তু কৃষকদের মধ্যে এই পদ্ধতির প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতা এখনো কম। অধিকাংশ কৃষক এখনো সনাতন পদ্ধতিতে পাট জাগ দিচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা ভালো দামও পাচ্ছেন। এটি পরিবেশবান্ধব একটি অর্থকরী ফসল হওয়ায় এর চাষ বৃদ্ধিতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। পানির সংকট মোকাবিলায় রিবন রেটিং পদ্ধতি প্রচারে আমরা কাজ করছি।’
পাটের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা ইত্যাদি জেলার বিভিন্ন পাটকল ও বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে জামালপুরের পাট। তবে জেলার অভ্যন্তরে একসময়কার সক্রিয় পাটকলগুলো এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়নের সম্ভাবনা থাকলেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে না।
এদিকে, মাঠে এখন চলছে পাট কর্তনের ব্যস্ততা। একই সঙ্গে প্রস্তুতি চলছে রোপা আমন ধান চাষেরও। পাট কেটে জমি খালি করেই নতুন মৌসুমের ধান রোপণে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন কৃষকরা।