উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ শুঁটকি বাজার নীলফামারীর সৈয়দপুর শুঁটকি বন্দর। দেশের দ্বিতীয় এই শুঁটকি আড়তকে ঘিরে শত শত পাইকারি, খুচরা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবিকা নির্ভরশীল হলেও নানা সমস্যা ও সংকটে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে শুঁটকি আড়ত ব্যবসায়ীদের। শুঁটকি বন্দর ঘুরে দেখা যায়, শত শত পাইকারি ও শ্রমিকদের হাঁকডাকে মুখর আড়তগুলোর পরিবেশ। প্রতিটি আড়তে বস্তায় ভরে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন জাতের শুঁটকি। কোথাও দরদাম হাঁকা চলছে, কোথায় আবার বস্তাভর্তি শুঁটকি সেলাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন শ্রমিকরা।
সপ্তাহে দুই দিন বসে হাট। দুই হাটে পাইকারি কেনাবেচার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ কোটি টাকার মতো। তাছাড়া প্রতিদিন আড়তগুলোতে খুচরা শুঁটকি বিক্রয় হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো। চলতি মৌসুমে দেশি শুঁটকির আমদানি তুলনামূলক বেশি, দামেও কম থাকায় বন্দর কিছুটা জমজমাট হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকেই যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি এবং শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য স্থায়ীভাবে কোনো হিমাগার না থাকায় প্রতিবছর গুদামে পচে নষ্ট হচ্ছে শত শত মণ শুঁটকি। শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য বাধ্য হয়ে জামালপুর, ঢাকা, চট্টগ্রামের হিমাগারে শুঁটকি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ পরিবহন খরচ, তাতে বাড়ছে দাম এবং কমছে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারগুলো থেকে পুঁটি মাছের শুঁটকির আমদানি কমে যাওয়ায় বিদেশে রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে, ফলে অতিরিক্ত আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আড়ত ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, ১৯৮০ সালে সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল এলাকায় যাত্রা শুরু করে এই শুঁটকি আড়ত। সময়ের ব্যবধানে এটি উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর শুঁটকি বন্দরে পরিণত হয়। খুলনা, পাবনা, বরিশাল, বরগুনা, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে পুঁটি, শোল, চিংড়ি, লইট্টা, চ্যাপা, বোয়াল, কাচকিসহ নানা প্রজাতির শুঁটকি আসে এই মোকামে। কয়েক বছর আগেও প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক পুঁটি শুঁটকি এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। শুধু পুঁটি মাছের শুঁটকি রপ্তানি করে বছরে প্রায় ১২০ কোটি টাকা আয় হতো বলে জানান আড়ত ব্যবসায়ীরা। এই মৌসুমে জানুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ২৪০ টন যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম । কয়েক বছর আগেও যেখানে ২ হাজার ৪০০ টন পুঁটি মাছের শুঁটকি রপ্তানি হতো ভারতে, সেখানে তা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোটায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দেখছেন রাজনৈতিক অস্তিরতা ও শুঁটকি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকার প্রধান কারণ।
ময়মনসিংহ থেকে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী বলেন, সৈয়দপুর এসেছি পুঁটি মাছের শুঁটকি কিনতে, প্রতিবছর পুঁটি মাছের শুঁটকি ভারতে রপ্তানি করি কিন্তু রাজনৈতিক সমস্যা ও সঠিক সময়ে এলসি সুবিধা না থাকায় অল্প পরিসরে রপ্তানি করছি। তাছাড়া পুঁটি মাছের শুঁটকির আমদানিও কম।
শুঁটকি ব্যবসায়ী আবুল সওদাগর জানান, মূলত পুঁটি মাছের শুঁটকি আসে চলনবিল থেকে, এ বছর বৃষ্টি কম হয়েছে যার ফলে পুঁটি মাছের শুঁটকির আমদানিও কম। তাছাড়া সংরক্ষণ সমস্যার কারণে মজুত করা সম্ভব হয়নি।
সৈয়দপুরের রপ্তানিকারক শাহাবুদ্দিন মিয়া বলেন, এই মৌসুমে রপ্তানিবাজারকে কেন্দ্র করে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক লোনের ঝুঁকি নিয়েছে। কিন্তু রপ্তানি না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ বছর সংকটে পড়েছে। শুঁটকি মাছ রপ্তানি করতে না পারায় ব্যাংক লোন শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তাছাড়া শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে এটা তো আছেই।
রংপুর থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, সৈয়দপুরের শুঁটকির মান ভালো, দামও তুলনামূলক কম, তাই এখান থেকে শুঁটকি নিয়ে বাজারে খুচরা ও পাইকারি বিক্রয় করি।
আরেক শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, সপ্তাহে দুই দিন শনিবার ও মঙ্গলবার এখানে শুঁটকির হাট বসে। এখানের শুঁটকির গুণগত মান ভালো, দামও কম। তাছাড়া এখানে বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি পাওয়া যায়।
চিবিরবন্দর থেকে আসা খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুর লতিফ বলেন, আমি সৈয়দপুর শুঁটকি আড়ত থেকে খুচরা শুঁটকি কিনে বিভিন্ন হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রয় করি। কম দামে ভালো মানের শুঁটকি পাওয়া যায় বলে এলাকায় চাহিদাও বেশি।
শুঁটকি মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বাছের আলী বাখার জানান, বর্তমানে সৈয়দপুর শুঁটকি আড়তে ৭৪টি খুচরা ব্যবসায়ী ও ১৩ পাইকারি আড়ত ব্যবসায়ী বয়েছে। তারা মাসে কমপক্ষে ১২০ কোটি টাকার শুঁটকি কেনাবেচা করে। এখানে কাজ করেন প্রায় ১ হাজার শ্রমিক। ৬০-৭০ প্রকার মাছের শুঁটকি পাওয়া যায় এখানে। ভারতে শুঁটকি রপ্তানি করতে না পারায় এবার খরচ তোলা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে বড় ধরনের লোকসানে পড়বে ব্যবসায়ীরা।
শুঁটকি আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ব্যবসা আগের মতো নেই। শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় বাড়তি টাকা খরচ করে অন্যত্র রাখতে হয়। তাছাড়া ব্যাংকের সুদের হার কমানো হলে ব্যবসা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, সরকারি উদ্যোগে এখনো কোথাও শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার তৈরি হয়নি। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে কেউ হিমাগার তৈরির উদ্যোগ নিলে মৎস্য কর্মকতার সঙ্গে সমন্বয় করে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। কৃষিনির্ভর হিমাগার নির্মাণের বিষয়ে সরকারিভাবে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে সৈয়দপুর শুঁটকি বন্দর থেকে প্রতিবছর ১২০ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়ে থাকে। যথাযথ সংরক্ষণব্যবস্থা ও সরকারি সহায়তা পেলে এই শুঁটকি বন্দর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।