আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) একজন নতুন চেয়ারম্যান এবং চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার (২ জুন) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন’বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ তথ্য জানান তিনি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। এরপর আর্থিক খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয় সরকার। তবে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আনেনি সরকার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ দেওয়া কমিশনের নেতৃত্বে চলছে সংস্থাটি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি করে আসছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীসহ বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এমনকি গত কয়েক মাসে একাধিক দফায় বিএসইসি নেতৃত্ব বদলেরও নানা গুজব ছড়ায় বাজারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিএসইসির নেতৃত্ব বদলের বিষয়ে মঙ্গলবার ইআরএফের সেমিনারে আনুষ্ঠানিক সময়সূচির ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।
সেমিনারে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসিতে এবার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ও পেশাজীবীদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যারা শেয়ারবাজার বোঝেন। চারজন কমিশনার ও একজন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। তাদের হাত ধরে শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তন (টার্ন অ্যারাউন্ড) আসবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, “আইনকানুন পরিবর্তনের ফলে অনেক ভালো কোম্পানি এখন শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেক বড় কোম্পানি এখন আমাকে বলছে, ‘আমরা এত দিন লিস্টেড হতে চাইনি। কারণ আমরা কোনো ক্যাসিনোতে লিস্টেড হতে চাই না, স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হতে চাই।’ এবার বাজারে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাবেন।”
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিগত দিনে বারবার লুটপাট করে শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের বড় সংকট হলো অনেক ব্যাংক আন্ডার-ক্যাপিটালাইজড (প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব) হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে টাকা লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের পাশাপাশি ডলারের অবমূল্যায়ন এবং বিভিন্ন লোকসানের কারণে দেশের অনেক বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এখন পুঁজিসংকটে ভুগছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সম্পূর্ণ পেশাদার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেনি। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যারা সত্যিকার অর্থে ক্যাপিটাল মার্কেট বোঝেন, এমন পেশাদারদেরই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিএসইসির একজন চেয়ারম্যান এবং চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই এটি দেখতে পারবেন।
তিনি বলেন, অতীতে নানা কারণে অনেক ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে চাইত না। কিন্তু পরিস্থিতি পরিবর্তনের কারণে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
অনেক উদ্যোক্তা এখন বলছেন তারা শেয়ারবাজারে আসতে চান। কারণ তারা ক্যাসিনোতে নয়, প্রকৃত স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে চান, বলেন আমির খসরু। তার মতে, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে ব্যাংক-নির্ভরতা কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার ও বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে।
সিডিবিএল গঠনের অভিজ্ঞতা
শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘একসময় শেয়ার সার্টিফিকেট জালিয়াতি, একই শেয়ার একাধিকবার বিক্রি বা বন্ধক রাখার মতো নানা অনিয়ম ছিল। এসব সমস্যা দূর করতে শেয়ারকে কাগজভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বের করে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিডিবিএলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে আমি নিজে এ উদ্যোগে যুক্ত ছিলাম। সংসদে আইন পাস করতে হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বোঝাতে হয়েছে। তখন অনেকেই বুঝতে চাইতেন না সিডিবিএল কী। বর্তমানে অনলাইন ও রিয়েল-টাইম ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারবাজার অনেক বেশি আধুনিক ও স্বচ্ছ হয়েছে।’
লুটপাটে দুর্বল ব্যাংক ও শেয়ারবাজার
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অনিয়মের কারণে দেশের অনেক ব্যাংক বর্তমানে আন্ডার-ক্যাপিটালাইজড অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে বহু বিনিয়োগকারীও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণ করা এবং বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন সরবরাহ করা।
সরকারের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা ও ফান্ড ম্যানেজারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), বৈশ্বিক বিভিন্ন ফান্ড ম্যানেজার এবং বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগানসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসছে। আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।’
ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংক ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিচ্ছে, যা টেকসই নয়। ব্যাংকের আমানত স্বল্পমেয়াদি। অথচ তারা হাজার হাজার কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিচ্ছে। এটি ব্যাংকের কাজ নয়। কার্যকর শেয়ারবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ সেখান থেকেই আসবে এবং ব্যাংকের ওপর চাপ কমে যাবে।