মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এ তথ্য জানান।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে নির্ধারিত ভর্তুকির অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে।
তিনি জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জনগণকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে উৎসাহিত করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কষ্ট বিবেচনায় এখন পর্যন্ত জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক এই সংকটের বাইরে নয়। তবুও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে এবং এতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তিনি সরকারের লক্ষ্য হিসেবে টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কার, বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে সরকার অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়ন, সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ এবং ঘাটতি অর্থায়নে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করছে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি। বিশেষ করে এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা খাত সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
পুঁজিবাজারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব প্রবাহের স্বাভাবিক চক্র সচল রেখে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
এলিস/এসজি/