রাজধানী ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা চলছে। উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা যেমন রয়েছে; তেমনি রয়েছে পরিকল্পনার অভাব। আর দুর্নীতি তো রয়েছেই। এসব কারণে সড়কের টেকসই ও স্থায়ী উন্নতি হচ্ছে না। পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একটি আধুনিক শহরের মূল কাঠামো হলো টেকসই রাস্তা ও ড্রেনেজব্যবস্থা। ঢাকায় এ দুই খাতেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুপস্থিত। বরং প্রত্যেক বর্ষা মৌসুম শেষে খোঁড়াখুঁড়ি ও জোড়াতালির কাজ যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা শহর বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। অথচ এ শহরের সড়কব্যবস্থা আজ নাগরিক জীবনের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বর্ষা শেষে প্রতিবছর নতুন করে দেখা দেয় একই সংকট; গর্ত, পানি, ধুলো আর জোড়াতালি দিয়ে মেরামতের গল্প। যথাযথ পরিকল্পনা ও জবাবদিহি না থাকলে; মানসম্মত কাজ না হলে এ জনভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পাবে না নগরবাসী। নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, ঢাকার রাস্তাঘাট যদি না বদলায়, উন্নয়ন কেবল কাগজেই থেকে যাবে। প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খানাখন্দে ভরা সড়কগুলোয় নামকাওয়াস্তে মেরামত করা হয়। অথচ প্রতিদিন এসব সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন লাখ লাখ মানুষ। ভাঙা রাস্তার কারণে একদিকে যেমন দেখা যায় দীর্ঘ যানজট, অন্যদিকে বেহাল রাস্তাঘাটের কারণে প্রতিদিনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহন। ভোগান্তিতে পড়ছেন রাস্তায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষ।
বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও সড়কের দৈন্যতার শেষ নেই। তথ্যমতে, উত্তর সিটি করপোরেশন এ বছর উন্নয়ন খাতে ৪ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। যার মধ্যে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দই সর্বাধিক ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজেটে সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে রয়েছে ৩৬৫ কোটি ১১ লাখ টাকা। বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। রাজধানীর অনেক সড়ক-উপসড়ক ও গলিতে রাস্তা এখন গর্ত, খাদ ও ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। বৃষ্টির সময় এসব স্থানে পানি জমে ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়। কোথাও কোথাও লোহার রড বেরিয়ে আসে, যা চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এ বিপর্যয়ের মূল কারণ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাব। সেই সঙ্গে রয়েছে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি। এ ছাড়া আছে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব। অপরিকল্পিতভাবে পানি, গ্যাস বা ড্রেনেজ লাইনের কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়ার পর সঠিকভাবে মেরামত না করায় অল্প সময়ের মধ্যে আবার তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি নামলেই রাস্তাগুলো ডুবে যায়, গর্তে পানি জমে থাকে; যা দ্রুত রাস্তার ক্ষতি ডেকে আনে। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও এভাবে ম্যানহোল নিচে রেখে রাস্তা কার্পেটিং করা হয়েছে। রাস্তাঘাট এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, হাঁটাও কষ্টকর। ফুটপাতগুলোও দখল হয়েছে। রাস্তা মেরামতের নামে এক ধরনের প্রহসন চলছে।
জধানীবাসীর অভিযোগ, সড়কের এ বেহাল অবস্থা সিটি করপোরেশনের চরম উদাসীনতার ফল। সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কোনো স্থায়ী পরিবর্তন দেখা যায়নি। কাজের মান যাচাই ও তদারকিতে কেউ গুরুত্ব দেয় না। এক এলাকার সংস্কার শেষ না হতেই অন্য এলাকায় একই কাজ শুরু হয়। কিন্তু কোথাও কোনো স্থায়ী উন্নয়ন নেই।
পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের এত বাজেট কোথায় এবং কোন কাজে যাচ্ছে তা জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মুখে বললাম উন্নয়ন হচ্ছে, বাস্তবে তা কতখানি হয়েছে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রতিদিন মানুষ সড়ক ব্যবহার করে। তাই এর পরিকল্পনাও সেভাবে করতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা তৈরি না হলে আমাদের লক্ষ্য অর্জন হবে না। সড়কের অবকাঠামো ঠিক না হলে জনভোগান্তির অবসান হবে না।
ঢাকার সড়কের দুরবস্থা নাগরিক জীবনের এক ভয়াবহ অভিশাপ। অফিসগামী মানুষকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে থাকতে হচ্ছে। এতে করে অফিসগামী মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় সড়কের বেহাল দশার অবসানকল্পে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে সুস্থ সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজধানীর সড়কগুলোর উন্নয়নে একটি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।