সরকার আয় বাড়াতে বাজেটে জনজীবনের পরতে পরতে রাজস্বের জাল বিস্তার করার কথা ভাবছে। সরকার বাধ্য হয়েই এ পথে হাঁটছে। বিগত দুই সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে রাজস্বের আওতা ও হার দুটোই বাড়াতে কাজ করছে বর্তমান সরকার। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। তারা আরও মনে করেন, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত। করপোরেট করহার কমানো প্রয়োজন। সাধারণ মানুষকে পদে পদে রাজস্বজালে আটকে ফেললে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিষয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের তিন খাত- আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কে কী পদক্ষেপ আনা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষভাবে ভ্যাটের আওতা ও হার বাড়ানো, করমুক্ত আয়সীমা, করপোরেট করহার, উৎসে কর, সম্পূরক শুল্ক, প্যাকেজ ভ্যাট, সম্পদ কর, অগ্রিম আয়কর আলোচনায় গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতের ধারা থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রী করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করা যায় কি না, তা নিয়ে এনবিআরকে ভাবতে পরামর্শ দিয়েছেন। বৈঠক থেকে দাবি করা হয়, ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানিতে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। রাজস্ব ফাঁকি কমাতে উৎসে করের হার বাড়ানো এবং আদায়ে কঠোরতা আনা প্রয়োজন।
বৈঠকে আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি। আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত শতাধিক খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য আমদানিতে উৎসে করের চাপ থাকছে। একই সঙ্গে নতুন করে ৫ শতাধিক পণ্যের সম্পূরক শুল্ক আরোপ হচ্ছে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়বে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। অনেকে মনে করছেন, সরকারের আয় বাড়াতে গিয়ে উল্টো রাজস্ব ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা থাকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, গত ২২ বছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সর্বনিম্ন। বেকারত্ব বাড়ছে। রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রায় সব খাতে খরচ বেড়েছে। গ্রামে ও শহরে সব জায়গায় খরচের চাপে দিশেহারা মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির সংকট আরও বাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাজেটে কর আরোপ করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
আসন্ন বাজেট সামনে রেখে সরকার নানা পরিকল্পনা করছে। দেশের রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য সরকার ভ্যাটের আওতা ও পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বাড়তি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এমনিতেই সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে অতিষ্ঠ। তার ওপর বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাব এবং বিগত সময়গুলোতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে। তাই এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়।